ঐতিহ্যবাহী রিকশাচিত্রকে স্বাস্থ্যশিক্ষার এক অনন্য মাধ্যমে পরিণত করেছে 'আমাদের গ্রাম ক্যানসার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার', যা মূলত আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্পের একটি উদ্যোগ। বাগেরহাটের রামপালে পরিচালিত এই কার্যক্রমটি প্রমাণ করছে যে, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং পরিচিত শিল্পভাষাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে জরুরি স্বাস্থ্যবার্তা পৌঁছে দেওয়ার এক কার্যকর পথ তৈরি করা সম্ভব।
রঙিন নকশায় ফুটে উঠেছে ফুল, পাখি আর লতাপাতার কারুকাজ। পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে গ্রামের ঘরবাড়ি, নদী এবং পালতোলা নৌকার চিরচেনা দৃশ্য। আর এই সব রঙিন দৃশ্যের মাঝখানে বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে—‘সব টিউমার ক্যানসার নয়।’ রিকশাচিত্রের ভেতরে এমন একটি বাক্য স্বাস্থ্যশিক্ষার এক নতুন সম্ভাবনার কথা বলে। যে শিল্প সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াত এবং পথঘাটের সঙ্গে মিশে আছে, সেই শিল্পই এখন অসুস্থতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি, ভুল ধারণা দূর করা এবং চিকিৎসার পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করার মাধ্যম হয়ে উঠছে।
রামপালের এই বিশেষ ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে আমাদের গ্রাম ক্যানসার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার। একটি গ্রামীণ চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগে ক্যানসার সচেতনতা ও স্বাস্থ্যশিক্ষার প্রসারে ঐতিহ্যবাহী রিকশাচিত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে এই উদ্যোগটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এর মাধ্যমে সামনে আসছে স্থানীয় শিল্প ও সংস্কৃতিনির্ভর স্বাস্থ্য-যোগাযোগের একটি বিশেষ 'রামপাল মডেল'।
এই উদ্ভাবনের মূল শক্তি নিহিত রয়েছে মাধ্যম নির্বাচনের ক্ষেত্রে। সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত একটি শিল্পরীতিকে বেছে নিয়ে তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে জীবন রক্ষাকারী জরুরি স্বাস্থ্যবার্তা। চিকিৎসাকেন্দ্রের গণ্ডির বাইরেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা শুরুর সুযোগ তৈরি করাই এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য।
ক্যানসারের মতো রোগ নিয়ে কথা বলা সহজ নয়। এই রোগের নামের সঙ্গে অনেকের মনেই ভয়, অনিশ্চয়তা এবং অসহায়ত্বের অনুভূতি জড়িয়ে থাকে। এছাড়া চিকিৎসার জটিল শব্দাবলির কারণে অনেক সময় তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে পড়ে। ফলে সঠিক তথ্য প্রদান এবং সেই তথ্যের অর্থবহ হয়ে ওঠার মাঝে একটি বড় দূরত্ব থেকে যায়।
উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস, রিকশাচিত্র সেই দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারে। এর উজ্জ্বল রং মানুষের নজর কাড়ে, পরিচিত দৃশ্যগুলো আপন অনুভূতি তৈরি করে এবং ছোট ছোট বাক্যগুলো সহজেই মনে রাখা যায়। দীর্ঘ নির্দেশনার পরিবর্তে একটি সহজ বার্তা মানুষকে থামিয়ে ভাবতে বাধ্য করতে পারে। এমনকি পরিবারের আলাপচারিতায় কিংবা পথের কথোপকথনেও এই বিষয়টি উঠে আসতে পারে।
‘সব টিউমার ক্যানসার নয়’—এই বার্তাটির মধ্যেই এই যোগাযোগপদ্ধতির একটি সফল উদাহরণ পাওয়া যায়। মূলত অযথা আতঙ্ক কমানোর উদ্দেশ্যেই এই কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের রং, সৃজনশীলতা এবং পরিচিত লোকশিল্পের সঙ্গে স্বাস্থ্যবার্তাকে মিলিয়ে সেটিকে সহজবোধ্য ও অর্থবহ করে তোলাই এই প্রকল্পের লক্ষ্য।
চিত্রগুলোর দৃশ্যভাষাও এই ভাবনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। লাল, নীল, হলুদ ও সবুজের উজ্জ্বল ব্যবহার; সাথে পাখি, পদ্মফুল, নদী ও গ্রামীণ প্রকৃতির মিশেল—সব মিলিয়ে একটি গুরুতর স্বাস্থ্যবিষয়কে জীবনের পরিচিত পরিসরে নিয়ে আসা হয়েছে। ক্যানসার নিয়ে আলোচনায় আশা ও মানবিকতার জায়গা তৈরির চেষ্টা এখানে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
আরেকটি চিত্রে লেখা হয়েছে ‘অসুখ-বিসুখে মনের জোরই সবচেয়ে বড় ওষুধ’। পরিচিত লোকজ অভিব্যক্তির মাধ্যমে এটি অসুস্থ মানুষের সাহস এবং মানসিক সমর্থনের প্রয়োজনীয়তাকে মনে করিয়ে দেয়। তবে স্বাস্থ্যশিক্ষায় এই কথার সঙ্গে একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকাও জরুরি যে, মনের জোর কখনোই চিকিৎসার বিকল্প নয়। বরং রোগীর কথা শোনা, তাঁকে একাকী বোধ করতে না দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে সহায়তা করাই হলো সেই সমর্থনের প্রকৃত রূপ।
রামপালের এই উদ্যোগ স্বাস্থ্যযোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে—মানুষের কাছে পৌঁছাতে আমরা তাঁর নিজস্ব সংস্কৃতিকে কতটা ব্যবহার করছি? স্থানীয় মাধ্যমের গুরুত্ব শুধু তার সহজলভ্যতায় নয়, বরং মানুষের অভিজ্ঞতা ও পরিচয়ের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্কের মাঝে। রিকশাচিত্রের মতো পরিচিত শিল্প স্বাস্থ্যবার্তার প্রতি মনোযোগ তৈরির সূচনা করতে পারে। এরপর স্বাস্থ্যকর্মীর আলোচনা, উঠান বৈঠক এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে সেই বার্তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিস্তার ঘটানো সম্ভব।
এই উদ্যোগের ফলে লোকশিল্পের সামনেও নতুন সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে। রিকশাচিত্রকে সমকালীন জনস্বাস্থ্যের কাজে যুক্ত করলে এর সামাজিক প্রয়োজনীয়তা ও কাজের পরিধি আরও বাড়বে। ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন তখন মানুষের বর্তমান জীবনে অর্থপূর্ণ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ঘটার সুযোগ পাবে। এই সম্ভাবনাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানটি আগামী শীত মৌসুমে বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রামপালে একটি আর্ট ক্যাম্পের আয়োজন, যেখানে সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের সৃজনশীল অংশগ্রহণ থাকবে এবং ক্যাম্পে আঁকা ছবি নিয়ে প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে।
প্রকল্পটির মূল সংস্থা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ এডুকেশন সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার প্রয়াত অধ্যাপক ও শিল্পী মাহমুদুল হক। শিল্প এবং সমাজসেবার সেই মেলবন্ধন এই উদ্যোগটিকে এক বিশেষ তাৎপর্য প্রদান করে। বর্তমানে সংস্থার নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রতিষ্ঠানের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও উন্নয়নকর্মী রেজা সেলিম। গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের কাছে সেবা ও তথ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রিকশাচিত্রের ব্যবহার একটি অত্যন্ত সৃজনশীল সংযোজন।
রামপালের এই প্রয়াস মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাস্থ্যশিক্ষায় উদ্ভাবন মানুষের পরিচিত জগতের মধ্য থেকেও আসতে পারে। বাংলার রিকশাচিত্র, সহজ ভাষা এবং একটি গ্রামীণ চিকিৎসাকেন্দ্রের সম্মিলিত উদ্যোগ সেই সম্ভাবনাকে সামনে তুলে ধরছে। পথের রঙিন ছবিটি যখন কাউকে প্রশ্ন করতে, ভয় নিয়ে কথা বলতে কিংবা সঠিক পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করবে, তখন লোকশিল্প মানুষের সুস্থতার যাত্রাতেও এক বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়ে উঠবে।