দুর্গাপূজা এবং সাপ্তাহিক ছুটির সমন্বয়ে টানা পাঁচ দিনের দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটকদের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠেছে পাহাড়ঘেরা বান্দরবান। জেলা শহরসহ বিভিন্ন উপজেলার হোটেল, মোটেল এবং রিসোর্টগুলোর প্রতিটি কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পর্যটন খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মতে, করোনাভাইরাসের মহামারির পর এবারই প্রথম বান্দরবানের আবাসিক হোটেল ও মোটেলগুলোতে শতভাগ বুকিংয়ের নজির দেখা গেল।

আজ মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের ব্যাপক আনাগোনা লক্ষ্য করা গেছে। সকাল ১০টার দিকে জেলা শহরের মেঘলা ও নীলাচল পর্যটন কেন্দ্র এবং চাঁদের গাড়ির স্টেশনে ভিড় জমে। দেখা গেছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর ও কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা এখানে এসেছেন।

পর্যটন কেন্দ্রগুলোর কর্মরতরা জানান, সাধারণত বিকেলের দিকে নীলাচল ও মেঘলায় পর্যটকদের ভিড় বেশি থাকে। তবে এবার সকাল থেকেই পর্যটকেরা সেখানে ভিড় জমাচ্ছেন। যারা আগের দিন হোটেল বা মোটেলে রাত কাটিয়েছে, তারা খুব ভোরেই বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছেন।

সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ্য করা গেছে চাঁদের গাড়ির স্টেশনে। গাড়ি পাওয়ার জন্য কাউন্টারে পর্যটকদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা পুরান ঢাকার বাসিন্দা আলাউদ্দিন বলেন, “৪৫ জনের একটি দল নিয়ে তাঁরা পাহাড় ও সমুদ্র ঘুরতে এসেছেন। চিম্বুক, নীলগিরি ও নীলাচল যাওয়ার জন্য গাড়ির অপেক্ষায় আছেন। পাহাড় ঘুরে আগামীকাল বুধবার কক্সবাজারে সমুদ্র দেখতে যাবেন তাঁরা।”

নীলাচলে কথা হয় গাজীপুরের বাসিন্দা রিফাত হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁরা নীলাচল, মেঘলা, শৈলপ্রপাত ও চিম্বুক ঘুরে রাতে ফিরে যাবেন। অন্যদিকে, রংপুর থেকে আসা ১৪ জনের একটি দল বগালেক এবং দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কেওক্রাডং দেখার উদ্দেশ্যে বান্দরবানে এসেছেন।

চাঁদের গাড়ির লাইনম্যান কামাল উদ্দিন জানান, আজ দুপুর পর্যন্ত প্রায় ৪০০টি পর্যটকবাহী গাড়ি দেবতাখুম, নীলগিরি, চিম্বুক, রুমা ও থানচির দিকে ছেড়েছে। তাঁদের কাছে প্রায় ৪২০টি চাঁদের গাড়ি (পুরোনো জিপ), জিপ ও মাইক্রোবাস রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, হোটেল-মোটেলে শতভাগ কক্ষ বুকিং থাকায় আজ আসা পর্যটকদের সবাইকে গাড়ি দেওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে। আগামীকালও গাড়ির সংকট থাকতে পারে।

মেঘলা পর্যটন মোটেলের ব্যবস্থাপক মো. শোয়েব বলেন, “আজ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত মোটেলের কোনো কক্ষ খালি নেই। এখনো প্রতিদিন কক্ষের জন্য পর্যটকেরা যোগাযোগ করছেন, কিন্তু তাঁদের কক্ষ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”

হোটেল দি মোরের ব্যবস্থাপক মো. জুবায়ের জানান, মঙ্গলবার থেকে শনিবার পর্যন্ত হোটেলের সব কক্ষ বুকিং রয়েছে। এরপর ২৫ ও ২৬ অক্টোবর পর্যটকের চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে ২৭ অক্টোবর থেকে মাসের শেষ দিন পর্যন্ত আবারও হোটেলের সব কক্ষ পূর্ণ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

জেলা হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জসীম উদ্দিন বলেন, করোনাভাইরাসের মহামারির পর এবারই প্রথম জেলা শহর ও বিভিন্ন উপজেলার সব হোটেল-মোটেলে শতভাগ বুকিং হয়েছে। ফলে অনেক পর্যটককে আবাসন দেওয়া সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলা শহর এবং রুমা, থানচি, আলীকদম ও লামা উপজেলায় ছোট-বড় প্রায় ২৫০টি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ১৩ থেকে ১৪ হাজার পর্যটকের রাত যাপনের ব্যবস্থা আছে।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) গোপা বিশ্বাস বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজার পরপরই বৌদ্ধদের প্রবারণা উৎসব থাকায় এবার পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে। দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটির পর ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর মারমা বৌদ্ধদের ঐতিহ্যবাহী ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে বা প্রবারণা উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। এ উৎসব ঘিরেও পর্যটকদের আগ্রহ রয়েছে। এরপর আবার দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় মাসের শেষ পর্যন্ত বান্দরবানে পর্যটকদের ভিড় থাকবে বলে আশা করছেন তাঁরা।