‘কী ছিলে আমার’, ‘সেই দুটি চোখ কোথায় তোমার’, ‘তুমি শুধু আমারই জন্য’—এই জনপ্রিয় গানগুলোর মাধ্যমে সংগীতাঙ্গনে নিজের এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেছিলেন মনি কিশোর। তবে সময়ের আবর্তে এক সময় সংগীতের জগত থেকে হঠাৎই দূরে সরে যান এই শিল্পী। অভিমান আর নীরবতার চাদরে ঢাকা জীবন কাটছিল এক সময়ের এই জনপ্রিয় গায়কের। অবশেষে ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর রাজধানীর রামপুরার বাসায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নড়াইলের লক্ষ্মীপুরে জন্ম নেওয়া মনি কিশোর একটি সংগীতপ্রেমী পরিবারের মধ্যেই বড় হয়ে ওঠেন। শৈশব থেকেই গানের প্রতি তাঁর ছিল তীব্র অনুরাগ। আশির দশকের শেষভাগে তিনি ঢাকায় এসে সংগীতের দুনিয়ায় প্রবেশ করেন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শ্রোতাদের কাছে তাঁর কণ্ঠের বিশেষত্ব ফুটে ওঠে।
নব্বইয়ের দশক ছিল মিক্সড অ্যালবামের স্বর্ণযুগ। সেই সময়ে মুক্তি পাওয়া ‘কী ছিলে আমার’, ‘তুমি শুধু আমারই জন্য’ এবং ‘সেই দুটি চোখ কোথায় তোমার’ গানগুলো মনি কিশোরকে রাতারাতি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে দেয়। প্রেম, বিরহ, অভিমান আর স্মৃতির আবেগকে তাঁর কণ্ঠে দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হতো। নিজস্ব প্রতিভার জোরে তিনি সংগীতাঙ্গনে এক বিশাল শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি করতে সক্ষম হন এবং নব্বইয়ের দশকের আধুনিক গানের অন্যতম জনপ্রিয় গায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
সেই সময়ে গাওয়া তাঁর গানগুলো আজও অনেক শ্রোতার কাছে নস্টালজিয়ার স্মৃতি হয়ে আছে। দীর্ঘ সংগীত জীবনে মনি কিশোর পাঁচ শতাধিক গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তিনি রেডিও ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী হওয়া সত্ত্বেও সেখানে খুব বেশি গান গাওয়ার সুযোগ পাননি, এমনকি সিনেমায় তাঁর কাজের পরিমাণও ছিল সীমিত। মূলত অডিও অ্যালবামের মাধ্যমেই তিনি তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা কাজগুলো করেছেন।
২০০০ সালের পর থেকে তিনি ধীরে ধীরে গান থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন। এক পর্যায়ে অভিমান করে নিজেকে পুরোপুরি সংগীত জগৎ থেকে সরিয়ে নেন তিনি। তবে গত বছর এক সাক্ষাৎকারে তিনি আকস্মিকভাবে জানান যে, তিনি আবারও গান শুরু করেছেন। তিনি আরও জানান, তাঁর পুরোনো গানগুলো পর্যায়ক্রমে ইউটিউবে আপলোড করছেন। বিশেষ করে তাঁর জনপ্রিয় গান ‘কী ছিলে আমার’ নতুন করে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য ছিল, “এ প্রজন্মের শ্রোতারা গানটি শুনেছেন।বিভিন্ন অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশ পাওয়া তাঁর গানগুলো ইউটিউবে প্রচুর ভিউ। প্রায়ই বিভিন্ন স্টেজে তরুণেরা তাঁর গান গেয়ে থাকেন। কিন্তু গানের মূল গায়ককে তাঁরা চেনেন না। গানটির সুরকার ও গীতিকার কে, তা–ও জানেন না অনেকে।” এই প্রজন্মের কাছে নিজেকে এবং তাঁর গানগুলোকে নতুন করে চেনানোর চেষ্টাই করছিলেন তিনি, কিন্তু সেই প্রচেষ্টার মাঝপথেই চলে গেলেন তিনি।
ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন? রামপুরার একটি বাসায় বসবাস করতেন এই গায়ক। বেশ কিছু দিন ধরে তাঁর ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। প্রতিবেশীরা ধারণা করেছিলেন, হয়তো তিনি গভীর রাতে ঘরে ফেরেন এবং পুনরায় বাইরে চলে যান। মাঝে মাঝে তিনি ঢাকার বাইরেও যেতেন। এরই মধ্যে হঠাৎ করে তাঁর বসবাস করা পপি ভবন এবং পাশের লাগোয়া ভবনের বাসিন্দারা তীব্র দুর্গন্ধ অনুভব করেন। সন্ধ্যার দিকে বাসার মালিকও গন্ধের উৎস খোঁজার চেষ্টা করেন, কিন্তু নির্দিষ্ট করে তা বুঝতে পারছিলেন না। এরপরই তাঁদের সন্দেহ হয় যে, মনি কিশোরের রুমটি দীর্ঘক্ষণ বন্ধ হয়ে আছে।
বাসার মালিক শামসুদ্দোহা তালুকদার কয়েকজন মানুষকে সাথে নিয়ে মনি কিশোরের দরজার সামনে যান। সেখানে দুর্গন্ধ এতটাই তীব্র ছিল যে তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না। তখনই তাঁরা ধরে নেন, মনি কিশোরের কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। অনেকবার ডাকাডাকি করার পর যখন কোনো সাড়া মেলেনি এবং তাঁর মৃত্যুর সন্দেহ প্রবল হয়, তখন তিনি মনি কিশোরের বন্ধু আদনান বাবুকে ফোন করে দ্রুত আসার অনুরোধ জানান। আদনান বাবু তাঁকে দ্রুত ৯৯৯-এ ফোন করার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে পুলিশের সহায়তায় ঘরের দরজা খোলা হলে গায়ককে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
পরবর্তীতে জানা যায়, মনি কিশোর দীর্ঘ দিন ধরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্য দিয়েও পার হচ্ছিলেন। পরিবারের সাথে তাঁর তেমন কোনো যোগাযোগ ছিল না। তাঁর সাবেক স্ত্রী শামীমা চৌধুরী এবং একমাত্র কন্যা নিন্তি চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। ১৯৬১ সালের ৯ জানুয়ারি নড়াইল জেলার লক্ষ্মীপুরে মনি কিশোর জন্মগ্রহণ করেছিলেন।