ফ্যাশন ও সৌন্দর্যপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের বার্ষিক ফ্যাশন শোর সবচেয়ে আলোচিত আকর্ষণ হলো ‘ফ্যান্টাসি ব্রা’। মডেলদের জন্য এই বিশেষ অন্তর্বাসটি পরিধান করা কেবল একটি সুযোগ নয়, বরং একে ধরা হয় তাঁদের ক্যারিয়ারের এক অনন্য সম্মান ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে। দীর্ঘ আট বছর পর আবারও ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের মঞ্চে ফিরে এসেছে এই ঐতিহ্যবাহী পোশাক, আর এবার মডেল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে মার্কিন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও প্রসাধনী ব্যবসায়ী কাইলি জেনারকে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এই আইকনিক অন্তর্বাস পরে র্যাম্পে হাঁটলেন তিনি।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে প্রথমবার এই বিশেষ ব্রা পরে র্যাম্পে হেঁটেছিলেন মডেল ক্লদিয়া শিফার। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে আলেসান্দ্রা অ্যামব্রোসিও এবং আদ্রিয়ানা লিমার মতো নামী মডেলরা এটি পরিধান করেছিলেন। সর্বশেষ ২০১৮ সালে মডেল এলসা হস্ককে এই ফ্যান্টাসি ব্রা পরতে দেখা গিয়েছিল।

রুপালি থং এবং সাদা মিনিস্কার্টের সাথে কাইলি জেনার পরেছিলেন এই বহুমূল্য অন্তর্বাস। পায়ে ছিল স্বচ্ছ হিল এবং পিঠে ছিল বিশাল সাদা পালকের ডানা, যা ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের র্যাম্পের চিরচেনা আভিজাত্য ও আবেদনকে ফুটিয়ে তুলেছে।

এবারের ‘ফ্যান্টাসি ব্রা’র আনুমানিক মূল্য ৫ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬১৮ কোটি ৬০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের সাথে যৌথভাবে এটি তৈরি করেছেন জ্যাকব অ্যান্ড কোংয়ের নকশাকার জ্যাকব আরাবো। বিলাসবহুল ঘড়ি ও গয়নার ব্র্যান্ডটির বিরল সংগ্রহের অনুপ্রেরণায় তৈরি এই নকশায় ব্যবহৃত হয়েছে মূল্যবান ধাতু ও রত্ন। ক্রিস্টালের কারুকাজ এবং নিচের দিকে ঝুলে থাকা ঝালর এর সৌন্দর্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

বিশেষ এই অন্তর্বাসে কোনো কাপড়ের ব্যবহার করা হয়নি; এটি সম্পূর্ণভাবে হীরা এবং ১৮ ক্যারেটের সাদা সোনা দিয়ে তৈরি। নকশাটি এমনভাবে করা হয়েছে যাতে র্যাম্পে হাঁটার সময় কাইলি জেনারের শরীরের নড়াচড়ার সাথে এটি স্বাভাবিকভাবে তাল মেলাতে পারে। ১৫ জন দক্ষ কারিগরের এক হাজার ঘণ্টারও বেশি পরিশ্রমে তৈরি এই পোশাকটি সম্পর্কে জ্যাকব অ্যান্ড কোংয়ের দাবি, এটিই এ পর্যন্ত তৈরি সবচেয়ে মূল্যবান ফ্যান্টাসি ব্রা।

নকশাকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৮ ক্যারেট সোনা এবং ৪ হাজার ৪১০টি হীরা দিয়ে এটি প্রস্তুত করা হয়েছে, যার মোট ওজন ১ হাজার ৩৭৩ দশমিক ৩৯ ক্যারেট। তবে পুরো আকর্ষণটি ছিল ৭৫ দশমিক ৫৪ ক্যারেটের একটি বিরল, উজ্জ্বল কাটের গাঢ় হলুদ রঙের হীরা, যা ‘ফ্যান্সি ভিভিড ইয়েলো’ শ্রেণির। গয়না নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের দাবি, শুধু এই একটি হীরার দামই ২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি টাকায় ২৭২ কোটি ১৮ লাখ ৬৪ হাজার ২০০ টাকা।

তবে পোশাকের আকাশচুম্বী দামের পাশাপাশি কাইলি জেনারকে মডেল হিসেবে নির্বাচন করা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা। কার্ডাশিয়ান পরিবারের সদস্য হওয়ায় কাইলির এই নির্বাচন মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ একে স্বাগত জানালেও অনেকের প্রশ্ন, দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সুপারমডেলদের পরিবর্তে কাইলিকে কেন এই সুযোগ দেওয়া হলো?

ব্রিটিশ সামাজিক মাধ্যম কৌশলবিদ ও বিপণন বিশেষজ্ঞ জোয়েল মারলিনারসনের মতে, কাইলিকে বেছে নেওয়া একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। বিবিসি নিউজবিটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ‘কাইলি এমন এক নতুন যুগের প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে ব্র্যান্ডগুলো গতানুগতিক মডেলের সংজ্ঞায় কে মানানসই সে বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে কাকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা যাবে, সেটিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।’ মারলিনারসনের মতে, তরুণ প্রজন্মের কাছে কাইলির ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে এবং কার্ডাশিয়ান বোনদের রিয়েলিটি শো দেখে এই প্রজন্ম বড় হয়েছে।

অন্যদিকে, ফ্যাশন জগতের পুরোনো অনুরাগীরা এই সিদ্ধান্তকে ঐতিহ্যের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল নাওমি ক্যাম্পবেলের মতো কিংবদন্তি সুপারমডেলদের স্বর্ণযুগ। সমালোচকরা বলছেন, প্রকৃত মডেলদের প্রতিভা ও দক্ষতাকে এখানে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে এবং আভিজাত্যপূর্ণ এই শো এখন মডেলিং দক্ষতার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের প্রধান সৃজনশীল কর্মকর্তা অ্যাডাম সেলম্যানের দাবি, কাইলি কেবল একজন ফ্যাশন তারকা নন, বরং তিনি ‘সংস্কৃতির এক শক্তিশালী প্রভাবক’ (ইনফ্লুয়েন্সার), যাঁর প্রভাব ফ্যাশন, সংস্কৃতি ও টেলিভিশনের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। এর থেকে স্পষ্ট হয় যে, প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলো এখন ঝুঁকি এড়িয়ে এমন কাউকে সামনে আনতে চায়, যাঁকে ঘিরে সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম তৈরি হবে এবং দর্শকদের দীর্ঘক্ষণ ধরে আকৃষ্ট রাখা যাবে।

উল্লেখ্য, দর্শকসংখ্যা হ্রাস, যৌন বৈষম্য, সেকেলে উপস্থাপনা এবং বৈচিত্র্যের অভাবের কারণে ২০১৮ সালের পর ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের ফ্যাশন শো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ২০২৪ সালে ‘সব ধরনের নারীকে উদ্যাপন’ করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এই আয়োজনটি আবারও শুরু হয়। সে বছর প্লাস-সাইজ মডেল অ্যাশলি গ্রাহামসহ বিভিন্ন শারীরিক গঠনের মডেলদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বৈচিত্র্যের ওপর গুরুত্ব দেয় ব্র্যান্ডটি। তবে সমালোচকরা মনে করছেন, ফ্যান্টাসি ব্রাকে ঘিরে এই বিপুল উন্মাদনা আসলে সমাজের রূঢ় বাস্তবতা থেকে আমাদের বিচ্ছিন্নতারই প্রমাণ। যেখানে সাধারণ মানুষ খাবার কিনতে বা বিদ্যুৎ বিল দিতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে এমন অকল্পনীয় অর্থব্যয় নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।