পথচারীদের রাস্তা পারাপার হওয়ার জেব্রা ক্রসিংয়ের পাশে কালো রঙের বোরকা পরিহিত এক নারীকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য। তাঁদের মধ্যে সাদা পোশাক পরিহিত একজন ব্যক্তির হাতে রয়েছে একটি তলোয়ার।

ঘেরাওয়ের ভেতরে থাকা ওই নারী আরবি ভাষায় আর্তনাদ করে বলতে শোনা যায়, “আমি হত্যা করিনি। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আমি হত্যা করিনি।” তিনি আরও চিৎকার করে বলেন, “হারাম। হারাম। হারাম। হারাম। আমি হত্যা করিনি...আমি তোমাদের ক্ষমা করব না...এটা অবিচার।”

এরপর সাদা পোশাক পরিহিত ব্যক্তিটি তাঁকে মাটিতে শুইয়ে দেন। ঘটনাস্থলটি ছিল পথচারীদের পারাপারের চিহ্নের নিকটেই, আর দূরে দেখা যাচ্ছিল পাহাড়। ওই নারী বারবার বলতে থাকেন, “আমি করিনি।” এরপর তাঁর শেষ চিৎকার শোনা যায় এবং সাদা পোশাক পরিহিত ব্যক্তিটি বাঁকানো তলোয়ার দিয়ে তাঁর শিরশ্ছেদ করেন।

গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

তবে তথ্যের সত্যতা যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের নয়। এটি ২০১৫ সালের একটি পুরোনো ভিডিও, যেখানে সৌদি আরবে এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। ওই নারী তাঁর সৎকন্যাকে যৌন নিপীড়ন ও হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) ওই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সংবাদ জানায়। এর পরদিন ১৫ অক্টোবর জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি কূটনৈতিক পত্র পাঠায়।

পরবর্তীতে ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে এই কূটনৈতিক পত্রটি পুনরায় প্রদান করা হয়। সাখাওয়াত হোসেন বৈঠক এবং আরেকটি কূটনৈতিক পত্র দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মুক্তকণ্ঠকে। তবে আলোচনার বিস্তারিত জানাতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছেন, জেদ্দার আলোচনায় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল প্রশ্ন তোলেন যে, নিয়মিত পাঠানো বন্দিতালিকায় ওই দুজনের নাম থাকলেও শাস্তির তথ্য কেন গোপন রাখা হলো।

নতুন করে দেওয়া কূটনৈতিক পত্রের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির মামলার বিস্তারিত বিবরণ, বিচারিক প্রক্রিয়ার সময় নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ আর দণ্ডিত হওয়ার পর তাঁরা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ আদৌ পেয়েছিলেন কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।”

ঢাকার কর্মকর্তারা জানান, গতকাল জেদ্দার আলোচনার সময় দণ্ডিত দুই বাংলাদেশির বিষয়ে যত দ্রুত সম্ভব বিস্তারিত জানানোর অনুরোধ করা হয়। বৈঠকে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০২৩ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারের পর যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রথমে নিম্ন আদালত দুই আসামির দণ্ড দেন। পরবর্তীতে আপিল আদালতের ১৩ জন বিচারকের প্যানেল তাঁদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। আদালতের রায় অনুযায়ী নারী ও পুরুষের জন্য নির্ধারিত পৃথক সেলে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

ভিডিওটি ২০১৫ সালের

আলোচিত ভিডিওর কয়েকটি স্থিরচিত্র নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যের মিডল ইস্ট আই ও ডেইলি মেইল, ইসরায়েলের টাইমস অব ইসরায়েল এবং পাকিস্তানের ডন-এর ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই দৃশ্য রয়েছে।

সৌদি আরবের সরকারি সংবাদ সংস্থা ও দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে ওই প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, শিরশ্ছেদ করা ওই নারীর নাম লায়লা বিনতে আবদুল মুত্তালিব বাসিম। তিনি মিয়ানমারের নাগরিক ছিলেন এবং সৌদি আরবে বসবাস করতেন। সৌদি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, ওই নারী তাঁর স্বামীর ছয় বছর বয়সী মেয়েকে নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের পর হত্যা করেছিলেন। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অর্থাৎ, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবি করে ২০১৫ সালের একটি পুরোনো ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে।

মরদেহ দেশে ফেরার দাবিও অসত্য

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার পাশাপাশি বিভিন্ন ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। এর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও সংবাদমাধ্যমের অনলাইন পেজে বিমানবন্দরে কফিন বহন করে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে, “সৌদি আরব থেকে দেশে আনা হলো নজরুল আর সিতির (সুইটি আক্তার) দেহ।”

তবে যাচাই করে দেখা গেছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফেরার এই দাবিটি সম্পূর্ণ ভুল। সৌদিপ্রবাসী অন্য এক ব্যক্তির মরদেহবাহী কফিনের ভিডিওকে তাঁদের মরদেহ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।

এই বিষয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক (কল্যাণ) ও অফিসপ্রধান শরিফুল ইসলামের সঙ্গে আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টা ২০ মিনিটে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “লাশ এখনো আসেনি।”

স্বামী-স্ত্রী ও ওমরাহ-দাবির সত্যতা নেই

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী ও পুরুষের ছবি দিয়ে তৈরি একটি ফটোকার্ড ছড়িয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই ব্যক্তি স্বামী-স্ত্রী ছিলেন এবং তাঁরা হানিমুনের পরিবর্তে ওমরাহ করতে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁদের স্বামী-স্ত্রী হওয়ার কোনো তথ্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়নি।

নজরুল ইসলামের বাবা আবদুল বাছির আলো মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নজরুল অবিবাহিত ছিল। তার সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মেয়েটি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।”

পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নজরুল ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে যান এবং মক্কার হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। সৌদি আরবে যাওয়ার আট মাস পর দেশটির পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং এরপর থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন।

গ্রেপ্তারের এক মাস পর পরিবার তাঁর আটকের খবর জানতে পারে। মাঝেমধ্যে মা-বাবার সঙ্গে কয়েক মিনিটের কথা বলার সুযোগ পেতেন নজরুল। তাঁদের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয় ১১ অক্টোবর, যা ছিল দুই থেকে আড়াই মিনিটের কথোপকথন। এরপর গত বুধবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সৌদি আরব থেকে একজন ফোন করে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি পরিবারকে জানান।

অর্থাৎ, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই ব্যক্তি স্বামী-স্ত্রী ছিলেন এবং ওমরাহ করতে গিয়েছিলেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব দাবির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

নজরুলের বাবা আবদুল বাছির মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। প্রথম সাত-আট মাসে ছেলে প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল, এরপর তিন বছর তিনি কারাগারে ছিলেন। আবদুল বাছির বলেন, “আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই, আমার ছেলের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।”

নজরুলের মা রহিমা বেগম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ছেলেই এক মাস পরপর ফোন করত। এক থেকে দুই মিনিট কথা বলত। আমার ছেলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হইছে, তা মিথ্যা। আমি শেষবারের মতো আমার ছেলের লাশ দেখতে চাই।”

অন্য প্রবাসীর মরদেহের ছবি প্রচার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও একটি ফটোকার্ডে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে কয়েকজনকে কাঁধে কফিন বহন করতে দেখা যায়। ছবিটির সঙ্গে “সৌদি আরব থেকে দেশে আনা হলো নজরুল আর সিতির দেহ” শিরোনাম যুক্ত করা হয়েছে।

ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে চলতি বছরের ৯ মে প্রকাশিত “সৌদি আরবে নিহত মুরাদের মরদেহ ১৬ দিন পর নিজ বাড়িতে” শিরোনামের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনেও একই ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার প্রবাসী মুরাদ শেখের মরদেহ ১৬ দিন পর দেশে পৌঁছায়। ৯ মে সকালে মরদেহটি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাঁর গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয় এবং বেলা ১১টায় জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

সুতরাং, সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত প্রবাসী মুরাদ শেখের মরদেহ দেশে আনার ছবিকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির মরদেহ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।