সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদীর দুটি বালুমহালের দখল কোনো প্রকার দরপত্র প্রক্রিয়া ছাড়াই বিএনপির এক নেতাকে বুঝিয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক বিশেষ আদেশের মাধ্যমে তাঁকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ হিসেবে দেখিয়ে জেলার সবচেয়ে বড় এই বালুমহাল দুটির দায়িত্ব গতকাল সোমবার বিকেলে হস্তান্তর করা হয়।

যিনি এই বালুমহালের দখল পেয়েছেন, তাঁর নাম নাছির মিয়া। তিনি তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি সুনামগঞ্জ-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারি করা আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাহিরপুর উপজেলার হলহলিয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং যাদুকাটা-২ বালুমহালের সাবেক ইজারাদার নাছির মিয়া ২০২৭ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত উক্ত নদীর দুটি মহাল থেকে বালু উত্তোলন করতে পারবেন।

পুরো বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তাপস শীল। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাতেই নাছির মিয়াকে দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ এই প্রক্রিয়ায় আইনের কোনো লঙ্ঘন বা ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভূমি মন্ত্রণালয় আমাদের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। আমরা যা করেছি, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাতেই করেছি।’

তবে মন্ত্রণালয়ের এই বিশেষ আদেশের মাধ্যমে কাউকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়াকে যথাযথ মনে করছেন না মহালটির সাবেক এক ইজারাদার। তাঁর মতে, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির উচিত ছিল প্রকাশ্য দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া অথবা খাস আদায়ের ব্যবস্থা করা। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৪৩২ বাংলা সনের জন্য যাদুকাটা নদীর যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল ১০৮ কোটি টাকায় জেলা প্রশাসন থেকে ইজারা নিয়েছিলেন জিনান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাহ রুবেল আহমদ এবং মেসার্স তাহিয়া স্টোন ক্রাশারের মালিক নাছির মিয়া। তবে মামলাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে তারা ইজারা নেওয়ার পাঁচ মাস পর মহালগুলোর দখল পান।

পরবর্তীতে ১৪৩২ বাংলা বছর শেষ হওয়ার আগেই নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে আরও পাঁচ মাস বালু উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন ওই দুই ব্যক্তি। আদালত তাঁদের পক্ষে আদেশ দিলেও জেলা প্রশাসন সেই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর আপিলের শুনানি শেষে আদালত রিটকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত নয় বলে রায় দেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন মহাল দুটিতে বালু উত্তোলন বন্ধ ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এরপর চলতি ১৪৩৩ বাংলা সনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য খাস আদায়ে ইজারা নিয়োগের উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। এই উদ্দেশ্যে ১৭ সেপ্টেম্বর জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা ডাকা হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়। এই পরিস্থিতির মধ্যেই দুই ইজারাদারই ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানান যে, তাঁদের ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে গণ্য করে বাকি সময়ের জন্য বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হোক।

গত ২২ সেপ্টেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয় এক আদেশের মাধ্যমে শুধুমাত্র নাছির মিয়াকে দুটি মহাল থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি প্রদান করে। আদেশে বলা হয়, গত তিন বছরের গড় বাজারমূল্যের ওপর অতিরিক্ত ১২ শতাংশ হারে দর নির্ধারণ করে বালু উত্তোলন করতে হবে। অবশিষ্ট সময়ের জন্য দুটি মহালের মোট রাজস্ব নির্ধারণ করা হয় ৪২ কোটি ৬৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪২২ টাকা।

অনুমতি না পেয়ে শাহ রুবেল আহমদ নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিট করেন। আদালত তখন ভূমি মন্ত্রণালয়ের আদেশ তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। তবে পরবর্তীতে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলে রিট আবেদনটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

এরপর ১৫ অক্টোবর একই বিষয়ে মহালের আরেক সাবেক ইজারাদার রতন মিয়া হাইকোর্টে রিট করেন। গত রোববার সেই রিটের কার্যকারিতা স্থগিত হয়ে যায়। এরপরই ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় গতকাল সোমবার নাছির মিয়াকে বালুমহাল দুটির দখল বুঝিয়ে দেয় প্রশাসন।