রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের একটি বিছানায় শুয়ে তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছে ১১ বছর বয়সী পথশিশু আবদুল্লাহ। তার বাঁ পা ব্যান্ডেজ করা, যেখানে ক্ষত অত্যন্ত গভীর। সামান্য নড়াচড়া করলেই ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে তার শরীর। এই শারীরিক কষ্টের মাঝেও আবদুল্লাহর মনে এখন কেবলই মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার তীব্র আকুলতা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সে এই প্রতিবেদককে বলে, ‘এখানে এমনে থাকতে আর ভাল্লাগে না। আমি মার কাছে ফিরা যাইতাম চাই। মার কাছে থাইক্কা পড়ালেখা করবার চাই। আমারে মার কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা কইরা দেন।’
ঘটনার সূত্রপাত ১ অক্টোবর দুপুরে। সদরঘাট এলাকার রাস্তায় শুয়ে ছিল আবদুল্লাহ। সেই সময় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা তার পায়ের ওপর দিয়ে চলে যায়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার ফলে তার বাঁ পায়ের পাতা থেঁতলে যায় এবং সেখানে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়।
দুর্ঘটনার পর তুফান নামের এক ব্যক্তি আবদুল্লাহকে উদ্ধার করে পুরান ঢাকার আদালতপাড়ার একটি ভবনের নিচে নিয়ে আসেন। সেখানে নোংরা কাপড় দিয়ে পায়ের ক্ষতস্থান পেঁচিয়ে দিন কাটাচ্ছিল সে। সঠিক চিকিৎসার অভাবে দিন দিন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। অবশেষে ১৩ অক্টোবর এই প্রতিবেদকের উদ্যোগে তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালের চিকিৎসক আবদুর রহমান জানান, আবদুল্লাহর পায়ে মারাত্মক সংক্রমণের সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার পায়ের ক্ষতিগ্রস্ত কিছু অংশ কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। পূর্ণ সুস্থতার জন্য তাকে আরও কিছুদিন হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নিতে হবে।
কয়েক বছর আগেই শুরু হয়েছিল আবদুল্লাহর পথজীবনের লড়াই। সে জানায়, তার বাড়ি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলায়। তার বাবার নাম মালেক এবং মায়ের নাম নূর নাহার। পারিবারিক কলহ ও ভাঙনের ফলে সে একা হয়ে পড়ে। এরপর লঞ্চে করে সে চলে আসে সদরঘাটে। সেই থেকে সদরঘাটের ফুটপাতই হয়ে ওঠে তার স্থায়ী ‘বসতি’।
বেঁচে থাকার তাগিদে কখনো প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে তা বিক্রি করে খাবার জোগাড় করেছে আবদুল্লাহ। কখনো অন্যের কাছে চেয়ে খেয়ে জীবন বাঁচিয়েছে, আবার অনেক সময় না খেয়েই কাটিয়েছে দীর্ঘ দিন।
দুর্ঘটনার পর তাকে উদ্ধারকারী তুফান বলেন, সরকারি বা বেসরকারিভাবে ছেলেটির আশ্রয়ের ব্যবস্থা না হলে তাকে হয়তো বেঁচে থাকার তাগিদে আবার সদরঘাটের ফুটপাতেই ফিরতে হবে।
আবদুল্লাহ বর্তমানে জানে না তার মা ও বাবা কোথায় আছেন। তবে সে বিশেষ করে তার মায়ের কাছে ফিরে যেতে চায় এবং স্কুলে পড়াশোনা করতে আগ্রহী। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবদুল্লাহ জানায়, তার মা অন্যত্র বিয়ে করেছেন। তাই তিনি তাকে এখন গ্রহণ করবেন কি না, তা সে জানে না।