বস্ত্র খাতের ব্যবসার পাশাপাশি চীনের সঙ্গে নানা ধরনের ব্যবসা করেন বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি (বিসিসিসিআই) মোহা. খোরশেদ আলম । চীনের ব্যবসা–বাণিজ্য, বিনিয়োগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে সম্প্রতি কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শুভংকর কর্মকার ।
দেশে চীনা ব্যাংকের শাখা খুলতে গত মাসে আপনারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন। হঠাৎ করে চীনা ব্যাংকের শাখা আনতে উদ্যোগী হলেন কেন?
খোরশেদ আলম: চীন আমাদের শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে বছরে ২০ বিলিয়ন বা ২ হাজার কোটি ডলারের বেশি বাণিজ্য হয়। বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কার মতো দেশেরও একটি ব্যাংক আছে—ব্যাংক অব শ্রীলঙ্কা। আমরা চীন থেকে এত পণ্য আমদানি করছি, সেখানে চীনের একটি ব্যাংক থাকলে বেশ কিছু সুবিধা হবে। আমদানি-রপ্তানির খরচ কমবে।
চীনা ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হলে কীভাবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সুবিধা হবে, একটু ব্যাখ্যা করবেন?
খোরশেদ আলম: মনে করেন, চীনে আমাদের প্রায় ৭০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই অর্থ যদি চীনা মুদ্রা ইউয়ানে আমাদের ব্যাংক হিসাবে জমা থাকে, তাহলে চীন থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ওই ইউয়ান ব্যবহার করা সম্ভব হবে। সে ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানির অর্থ ডলারে, কিংবা ডলার থেকে ইউয়ান বা টাকায় রূপান্তর করতে হবে না। মধ্যবর্তী ব্যাংকের কমিশন ও মুদ্রা বিনিময়ের খরচ কমে আসবে। এতে গড়ে প্রায় ১ শতাংশ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব। এই দুর্দিনে ১ শতাংশ অর্থও কম নয়। আরেকটা বিষয় হলো, আমাদের ব্যাংকগুলোর অনেকের পুঁজি নেই, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দিতে পারছে না। চীনা ব্যাংক এলে তারা নিশ্চিতভাবে পুঁজি নিয়ে আসবে। তারা তো টাকা নিয়ে এসে বসে থাকবে না। ব্যাংক চালাতে হলে সেই টাকা বিনিয়োগ করবে, ঋণ দেবে ও লাভ করবে। সেখান থেকে আমাদের কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুঁজি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। এই উদ্দেশ্যেই আমরা চীনা ব্যাংক চালুর প্রস্তাব করছি।
চীন এখন বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগের উৎস। গত বছর চীনের নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। চীনারা এখন কোন ধরনের শিল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে?
খোরশেদ আলম: চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও বাগেরহাটের মোংলায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশ বা সাবেক বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) হিসাবে, আনোয়ারায় চীনা বিনিয়োগ ১৩০ কোটি ডলার হতে পারে। যদিও অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ হবে ২০৩১ সালে।
চীনারা মূলত টেক্সটাইল ও চামড়া খাতে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী। বস্ত্র খাতে কাপড় উৎপাদনে তাদের আগ্রহ বেশি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বড় বাজার এবং পোশাক রপ্তানির সুযোগ তাদের এই খাতে বিনিয়োগ বেশি আকৃষ্ট করছে। আরেকটি সম্ভাবনাময় খাত হলো, পোশাকশিল্পের বর্জ্য থেকে ফাইবার তৈরি। চীনা কিছু প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে পোশাকশিল্পের ঝুট কিনে ফাইবার তৈরি করে ভিয়েতনামে রপ্তানি করছে। পরে সেই ফাইবার দিয়ে সুতা ও সোয়েটার তৈরি হচ্ছে। দেশে এ ধরনের কাজ করা গেলে বাংলাদেশেই মূল্য সংযোজন করা সম্ভব। এ ছাড়া তারা লিথিয়াম ব্যাটারি, সৌরবিদ্যুৎ ও হাসপাতাল সরঞ্জাম উৎপাদনেও আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিশেষ করে লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদনে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে।
উচ্চ শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের অনেক পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদি চীনারা বাংলাদেশে প্রযুক্তি নিয়ে এসে সেসব পণ্য ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ হিসেবে তৈরি করে তবে দ্রুত রপ্তানি বাড়বে। কারণ, তাদের বাজার তো প্রস্তুতই আছে। আমি মনে করি, এমনটা করলে বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে।
প্রযুক্তির দিক থেকে চীন অনেক এগিয়ে রয়েছে। আনোয়ারা ও মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীন থেকে হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায় না?
খোরশেদ আলম: অবশ্যই আমাদের সেই চেষ্টা করা উচিত। তবে সমস্যা হচ্ছে, দেশে হাইটেক শিল্পের জন্য দক্ষ জনবলের সংকট রয়েছে। সেই সংকট দূর করতে হলে অর্থনৈতিক অঞ্চলের আশপাশে পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা দরকার। সেখানে চীনারা তাদের চাহিদামতো বিষয়ে জনবল তৈরির সুযোগ পাবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলের আশপাশে শ্রমিকদের জন্য কোয়ার্টার বানাতে হবে। আনোয়ারার আশপাশে তো বাড়িঘর নেই, ৩০-৪০ মাইল দূর থেকে শ্রমিক নিতে হবে। এটি বেশ ব্যয়সাধ্য হবে। এ ছাড়া স্কুল, হাসপাতাল বাজার ইত্যাদি সুযোগ–সুবিধাও নিশ্চিত করা জরুরি।
চীন থেকে আমরা কী ধরনের বিনিয়োগ চাই, সেই বিষয়ে সরকারের দিক থেকে কোনো গাইডলাইন আছে কি?
খোরশেদ আলম: বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু খাত সুনির্দিষ্ট থাকা ভালো। এখন যদি চীনের কোনো উদ্যোক্তা বলেন, ‘আমি একটা স্পিনিং মিল করব।’ তাহলে আমাদের জিজ্ঞাসা করতে হবে, কী জন্য? সেই উদ্যোক্তা যদি বলেন, স্থানীয় বাজারে সুতা বিক্রি করবেন। তাহলে আমাদের বলতে হবে, এই বিনিয়োগ আমাদের দরকার নেই। আর যদি চীনা উদ্যোক্তা বলেন, পণ্যটি ভিয়েতনাম, চীন, দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি করবেন তাহলে ঠিক আছে। তা ছাড়া চীনের উদ্যোক্তারা যদি লিথিয়াম ব্যাটারি বানাতে চান, তাহলে স্বাগত জানানো উচিত। সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বানাতে চাইলেও দ্রুত অনুমতি দেওয়া দরকার। কারণ, এসব খাতে আমাদের বিনিয়োগ দরকার। এ ছাড়া চীনের উদ্যোক্তারা ব্যাটারিচালিত মোটরসাইকেল কিংবা গাড়ি তৈরি করতে চাইলেও স্বাগত জানানো উচিত।
এ দেশে চীনা বিনিয়োগ এনে সেখানে তৈরি পণ্য চীনে রপ্তানির সুযোগ আছে কি?
খোরশেদ আলম: বর্তমানে চীনে ছোট ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তারা এখন বলপেনের মতো কলম বানাতে চায় না। সিরামিকের কাপ বানাতে আগ্রহী নয়। প্লাস্টিকের বোতলসহ ছোটখাটো পণ্য বানাতেও তাদের আগ্রহ নেই। তারা চায়, মোবাইলের মতো উচ্চ প্রযুক্তির পণ্য বানাতে, যেটার দাম বেশি। ফলে তাদের দেশে চাহিদা আছে, এমন পণ্য আমাদের দেশে উৎপাদন করে রপ্তানি করা সম্ভব। সেটি আমাদের বিনিয়োগেও সম্ভব। যেমন চীনা সারা বিশ্ব থেকে তাদের চাহিদার ৩০ শতাংশ তৈরি পোশাক আমদানি করে। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে চীনে প্রচুর পরিমাণে তৈরি পোশাক রপ্তানি হলেও বাংলাদেশ থেকে খুব বেশি রপ্তানি হয় না। চীনের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিনা শুল্কে বাংলাদেশের পণ্য চীনের বাজারে বিক্রির সুযোগ দিতে কুনমিংয়ে বিনা মূল্যে একটি স্থায়ী প্রদর্শনকেন্দ্র ও একটি গুদাম পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সেখানে আমরা বাংলাদেশের পণ্য প্রদর্শন করে রপ্তানি বাড়াতে পারি।
বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীনের বিনিয়োগকারীদের প্রধান প্রধান বাধা কোথায়?
খোরশেদ আলম: চীনের বিনিয়োগকারীদের এই মুহূর্তে বড় অভিযোগ হচ্ছে, জ্বালানিসংকট। তারা বলছে, জ্বালানি না পেলে বিনিয়োগ করবে কীভাবে। দ্বিতীয়ত, কারিগরিভাবে দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতিও তাদের জন্য উদ্বেগের। এ ছাড়া ব্যাংক–সুবিধা পাবে কি না, এসব নিয়েও তাদের মধ্যে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। সেই সঙ্গে নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজি নিয়েও তাদের উদ্বেগ রয়েছে। আমাদেরই এক সদস্য সম্প্রতি আমার কাছে একটা অভিযোগ করেছেন। নরসিংদীর মাধবদীতে একটি ব্যাটারি তৈরির কারখানায় চাঁদা দাবি করা হয়েছে কিন্তু ওই ব্যবসায়ী ভয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ করতে চান না।
দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংয়ের বিনিয়োগ এনে শিল্প খাতের চেহারা বদলে দিয়েছে ভিয়েতনাম। চীন থেকে এমন কোনো বিনিয়োগ আনার সুযোগ কী আছে। যার মাধ্যমে আমাদের শিল্প খাতে বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে?
খোরশেদ আলম: বড় পরিবর্তনের জন্য যে পরিকল্পনা দরকার, তা আমাদের নেই। মোংলার অর্থনৈতিক অঞ্চল যেটা সম্প্রতি চীনকে দেওয়া হয়েছে, প্রথমে সেটি ভারতকে দেওয়া হয়েছিল। এক দশক অপেক্ষার পর গত জুলাইয়ে আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। তো এত দিন জমিটা ফেলে রাখা হলো কেন? এতগুলো বছর জমি ফেলে রেখে কোনো আউটপুট তো আসেনি। তাই আমি মনে করি, যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া দেশের শিল্প খাতে বড় কিছু হবে না।
চীনের মতো দক্ষ জনবল তৈরির উপায় কী?
খোরশেদ আলম: আমাদের দেশে সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্ম আছে। এই প্রজন্মকে কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এরপর সেই দক্ষতা ব্যবহার করে আমরা আমাদের শিল্পকারখানাগুলোর অনেক বেশি প্রতিযোগিতাসক্ষম করতে পারি। পাশাপাশি উচ্চ প্রযুক্তির শিল্প চালানোর জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। তার জন্য চীন কীভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার করে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে এনেছে, সেটি আমাদের রপ্ত করতে হবে। প্রয়োজনে চীনা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আসতে হবে। তাহলেই দেশের অর্থনীতির উন্নতি দ্রুতগতিতে হবে বলে আমি মনে করি।