যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাসায়নিক প্রকৌশলে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন জ্যাক ওয়েইস। এর আগে তিনি রাইস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন, যেখানে তিনি সর্বোচ্চ সম্মানসূচক ফলাফল অর্জন করেছিলেন। তাঁর মেধার স্বাক্ষর এতটাই প্রবল যে, ২০২৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সময় নোবেল কমিটির আলোচনায় তাঁর গবেষণার উল্লেখ ছিল। তবে এই অসাধারণ শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং গবেষণার সাফল্য থাকা সত্ত্বেও ২০২৪ সালে পিএইচডি শেষ করার পর থেকে দুই হাজার ৩০০টির বেশি চাকরিতে আবেদন করেও কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থান খুঁজে পাননি ওয়েইস।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে জ্যাক ওয়েইসের চাকরি খোঁজার এই কঠিন অভিজ্ঞতার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওয়েইস শুরুতে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক কোম্পানিতে চাকরির চেষ্টা করেন। পাশাপাশি জাতীয় গবেষণাগারগুলোর মর্যাদাপূর্ণ পোস্টডক্টরাল গবেষণার সুযোগও খুঁজেছিলেন তিনি। যখন সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখন তিনি সফটওয়্যার প্রকৌশলসহ বিভিন্ন ভিন্ন খাতের চাকরিতেও আবেদন শুরু করেন। পরিস্থিতি এতটাই হতাশাজনক হয়ে পড়ে যে, একপর্যায়ে তিনি হিমায়িত কাঁকড়ার কেক বিক্রি করা একটি প্রতিষ্ঠানে খাবার প্রস্তুতের সাধারণ কাজেও আবেদন করেন, কিন্তু সেখান থেকেও কোনো সাড়া পাননি তিনি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান শ্রমবাজারে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যাকে তারা ‘লো-হায়ার, লো-ফায়ার’ পরিবেশ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই ব্যবস্থার অর্থ হলো, প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মী নিয়োগের হার কমিয়ে দিয়েছে, আবার বিদ্যমান কর্মীদের ছাঁটাই করার প্রবণতাও তুলনামূলকভাবে কম।
এর ফলে যারা বর্তমানে চাকরিতে আছেন, তারা ঝুঁকি নিয়ে চাকরি পরিবর্তন করছেন না। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নতুন চাকরিপ্রার্থীদের ওপর এবং তাদের জন্য সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের এক গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে।
চাকরি পাওয়ার এই কঠিন লড়াইয়ের পেছনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে যেমন প্রতিষ্ঠানগুলো দৈনন্দিন কর্মক্ষেত্রে এআই-এর ব্যবহার বৃদ্ধি করছে, অন্যদিকে চাকরির আবেদন যাচাই এবং যোগ্য প্রার্থী বাছাই করার প্রক্রিয়ায় এই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
বিপুল সংখ্যক আবেদনপত্র জমা পড়ায় নিয়োগকর্তারা এখন এআই-ভিত্তিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে সেগুলো যাচাই করছেন। অন্যদিকে, চাকরিপ্রার্থীরাও তাদের আবেদনপত্র তৈরি বা পরিমার্জিত করতে এআই-এর সাহায্য নিচ্ছেন। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির আধিপত্য আরও প্রবল হচ্ছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান মারকরের মাধ্যমে ঘণ্টায় ৭০ ডলার পারিশ্রমিকের একটি কাজ পান ওয়েইস। এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এআই-কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ পরিচালনা করে।
সেখানে ওয়েইসের দায়িত্ব ছিল রাসায়নিক প্রকৌশল বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তৈরি করে সেগুলো একটি বৃহৎ ভাষা মডেলে (Large Language Model) প্রদান করা। এরপর এআই যে উত্তরগুলো তৈরি করত, সেগুলো মূল্যায়ন করে আরও উন্নত করার চেষ্টা করতেন তিনি। তবে এই কাজে কোনো নিশ্চয়তা ছিল না; কোনো সপ্তাহে তিনি ২০ ঘণ্টা কাজ পেতেন, আবার কোনো সপ্তাহে তা মাত্র চার ঘণ্টায় নেমে আসত।
জ্যাক ওয়েইসের এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, উচ্চশিক্ষা, অসাধারণ গবেষণার দক্ষতা এবং গভীর প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সময়ে চাকরির নিশ্চয়তা পাওয়া কতটা কঠিন। বিশেষ করে এমন এক শ্রমবাজারে যেখানে নতুন নিয়োগ সীমিত এবং এআই একই সাথে কাজের ধরন ও চাকরিতে প্রবেশের প্রচলিত প্রক্রিয়াকে আমূল বদলে দিচ্ছে।