ঘটনাটি ঘটেছিল গত রোববার। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছেন, এই খবরটি আমার জানা ছিল। সাক্ষাৎ শেষ করে ইশরাক হোসেন বেরিয়ে গেছেন, সেই তথ্যটিও আমার কাছে ছিল। তবে সেই একান্ত বৈঠকের ভেতরে ঠিক কী আলোচনা হয়েছে, তা জানতাম না।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে আমি বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করি এবং তাঁকে ফোন করি। কিন্তু তিনি কোনোভাবেই তথ্য দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর এক পর্যায়ে তিনি কেবল একটি শব্দ উচ্চারণ করলেন—‘নাই’।

এই ‘নাই’ শব্দের প্রকৃত অর্থ কী ছিল? ইশরাক হোসেন কি আর মন্ত্রিসভায় থাকছেন না? তাঁকে কি পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে, নাকি অন্য কোনো বিষয়—তার কোনো উত্তর তখন পাওয়া যাচ্ছিল না। এরপর আমি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা শুরু করি। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর এক পর্যায়ে বিষয়টি নিশ্চিত হলাম। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই রোববার রাত ১০টার দিকে মুক্তকণ্ঠ অনলাইনে প্রকাশিত হয় ‘মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি।

খবরটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই হাজার হাজার পাঠক মুক্তকণ্ঠতে ভিড় করতে শুরু করেন। আমার মুঠোফোনে একের পর এক কল আসতে থাকে। কেউ খবরটির সত্যতা নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন, আবার কেউ জানতে চেয়েছিলেন তথ্যের সূত্রের পরিচয়। ঠিক এই সময়েই যাঁকে নিয়ে প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছে, তিনি নিজেই খবরটিকে গুজব বলে উড়িয়ে দিচ্ছিলেন।

বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) রাত সাড়ে ১০টার দিকে খবরটি তাদের স্ক্রলে প্রচার করে এবং পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করে নেয়। তবে মুক্তকণ্ঠ নিজেদের অবস্থানে অটল ছিল। কারণ, আমাদের সূত্রটি ঘটনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিল। এছাড়া একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবরটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার পরেই আমরা তা প্রকাশ করেছিলাম।

এর আগে শনিবার অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমেছিলেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ওই অভিযানের ভিডিও তিনি নিজেই তাঁর ফেসবুক পাতায় পোস্ট করেন, যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

দল ও সরকার এই বিতর্কিত বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে, সেই খোঁজ রাখছিলাম আমি। এরই মধ্যে রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি জানান, মন্ত্রিসভার বৈঠক শুরুর আগে তিনি ইশরাক হোসেনকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে দেখেছেন। তবে এর বাইরে তিনি আর কিছু জানেন না। আমি জানতে চাইলাম, সভায় ইশরাক হোসেনকে নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না। উত্তরে তিনি জানান, হয়নি।

সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে একজন প্রতিমন্ত্রীকে দেখা যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে যাঁকে নিয়ে বিতর্ক চলছে, তাঁকে সেখানে দেখা যাওয়ার বিষয়টি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক ছিল।

আমি অফিসে বসেই নজর রাখছিলাম যে বৈঠকটি কখন শেষ হবে। বৈঠক শেষ হওয়ার পর আরও কয়েকজনকে ফোন করি। সবার কাছ থেকে একই উত্তর পাই—ইশরাক হোসেনকে নিয়ে সভায় কোনো আলোচনা হয়নি। তবে সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পর জানতে পারি যে, প্রধানমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে ডেকেছেন।

প্রধানমন্ত্রী কেন তাঁকে ডেকেছেন বা কী বলেছেন—সে সময় সেসবের কিছুই আমার জানা ছিল না। তবে এই তথ্য পাওয়ার পর আমি যোগাযোগ আরও বাড়িয়ে দিই। একপর্যায়ে জানতে পারি, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা শেষ করে ইশরাক হোসেন বেরিয়ে গেছেন। এরপর আমি এমন একজন সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করি, যাঁর কাছে বিস্তারিত জানার সুযোগ ছিল বলে আমার মনে হয়েছিল।

তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল, কিন্তু মূল প্রশ্নের উত্তর মিলছিল না। ঠিক কী ঘটেছে, তা জানতে চাইছিলাম আমি। দীর্ঘ আলাপের একপর্যায়েই সেই রহস্যময় শব্দটি এল—‘নাই’।

মুক্তকণ্ঠের রিপোর্টিং বিভাগে আমি সাড়ে আট বছর ধরে কাজ করছি। আমি দেখেছি, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া মুক্তকণ্ঠ কোনো খবর প্রকাশ করে না। ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগ করতে বলার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর আমি মুক্তকণ্ঠের চিফ অব ফাস্ট রিপোর্টিং টিপু সুলতানকে বিষয়টি জানাই। তিনি তাঁর নিজস্ব সূত্র থেকে তথ্যটি যাচাই করেন। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে যাচাই এবং আনুষ্ঠানিক উদ্ধৃতি পাওয়ার চেষ্টার পর অনলাইনে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।

প্রতিবেদনটি অনলাইনে আসার পর থেকেই ফোনের পর ফোন আসতে থাকে। এরই মধ্যে ইশরাক হোসেন একটি অডিও বার্তা দেন, যেখানে তিনি খবরটিকে গুজব দাবি করেন। তাঁর এই বক্তব্য ও বিবৃতির কারণে অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। তবে আমরা জানতাম, আমাদের সংগৃহীত তথ্য সঠিক।

মুক্তকণ্ঠের খবরটিকে ভুয়া দাবি করে ইশরাক হোসেন এবং তাঁর সমর্থকেরা একের পর এক ফেসবুক পোস্ট দিতে থাকেন। তবে আজ সোমবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে ইশরাক হোসেন নিজেই ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে জানান, বেলা দুইটায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেবেন।