জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি হবে স্বৈরাচারের ফেরার পথ উন্মুক্ত করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক বিরোধিতার নামে যদি স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তনের সুযোগ তৈরি করা হয়, তবে তা হবে জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধী দল অবশ্যই বিরোধিতা করবে, তবে তা হতে হবে গঠনমূলক। বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতা করার পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’

আজ সোমবার রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ এবং আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যানের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তারেক রহমান উল্লেখ করেন, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে বিএনপি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করেছে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধী দলের ভূমিকা পেয়েছে। তাঁর মতে, সংসদের ভেতরে সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রধান কাজ হওয়া উচিত দেশের স্বার্থ এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করা।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সরকার চেষ্টা করছে দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে। জনগণের ভোট নিয়ে আপনারা যেমন বিরোধী দলের আসনে বসেছেন, আমরাও জনগণের সমর্থন নিয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছি। সরকারি দল মানেই জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না, আর বিরোধী দলই শুধু জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।’

বিরোধী দলের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন এবং যারা আহত হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সম্মান জানাতে সরকার যে অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল, সেখানে বিরোধী দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জুলাইয়ের শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ তাঁদের সামনে ছিল। তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যাঁরা রাজনৈতিক পরিচিতি পেয়েছেন, তাঁদের প্রতি সম্মান জানাতে সবারই এগিয়ে আসা উচিত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করার অর্থ হচ্ছে, সেই আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী ব্যক্তিদের পাশে থাকা এবং তাঁদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করা।

গণতন্ত্রের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেছিলেন।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে সবার সব বিষয়ে একমত না হওয়াকে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তবে দেশের মানুষের কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, চিকিৎসাসেবা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়ে আমাদের একমত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।’

সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব অবস্থান থাকতে পারে বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যই জনগণ তাঁদের সংসদে পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, সংসদে আলোচনার মাধ্যমে যুক্তি ও মতামত তুলে ধরে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে দেশের সাধারণ মানুষ তাঁদের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে পারেন।

ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের উন্নয়ন ও মানুষের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। তবে স্থাপনা তৈরির সময় প্রকৃতির ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, উন্নয়নকাজের পাশাপাশি বিদ্যমান গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ করা জরুরি। ভবিষ্যতে স্থাপত্য ও অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও প্রকৃতিকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।

সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচ্ছন্নতা তুলনামূলক ভালো হলেও সরকারি হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকাগুলোতে পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে আরও নজর দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের এ বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে, যাতে রোগীরা পরিচ্ছন্ন পরিবেশে চিকিৎসা নিতে পারেন।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থল পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনা ও সরকারি নীতি বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের নিজেদের আচরণেও পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশসচেতনতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।’

পরিবেশদূষণ ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে রোগব্যাধি বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়তে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তিনি ওসমানী উদ্যানের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দর্শনার্থীদের উদ্যান ও স্মৃতিস্তম্ভের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও ওসমানী উদ্যান জনগণের ও রাষ্ট্রের সম্পদ। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলেও তা যথাযথভাবে পালনে নাগরিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন।

জুলাই ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে মিল রয়েছে। তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করবে, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি দেশের মানুষ যেন মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা পায়, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং সবাই নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে পারে—এ প্রত্যাশাও ছিল শহীদদের। তাই শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।’

বিএনপি সরকার জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণে কাজ করছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সহায়তা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সরকার ধীরে ধীরে কাজ করে যাচ্ছে।

আজ সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান। এরপর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেন তারেক রহমান।

উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন। পরে তিনি আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যান উদ্বোধন করেন এবং উদ্যানের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন। এ সময় তিনি উদ্যানসংলগ্ন গ্রন্থাগারও পরিদর্শন করেন।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে নির্মিত ৯০ ফুট উঁচু স্মৃতিস্তম্ভটি প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে ৮৩৪ জন শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে। এর সামনে স্থাপন করা হয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।

স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের দিকে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে চার ফুট উঁচু এবং ভেতরের দিকে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৭ ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য রয়েছে। এসব ভাস্কর্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন বৃক্ষরোপণ ও সবুজ দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে।

এ ছাড়া উদ্যানটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিং–সুবিধা এবং জলাশয়ের ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। দুই স্তরে সাজানো উদ্যানটিতে সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে দ্রুত চলাচলের পথ রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, স্থানীয় সরকার সচিব শহীদুল আলম বক্তব্য দেন।

এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর বাবা মীর মুস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তিও বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ হাবিবসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।