ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় খিরু নদীর ওপর সাড়ে আট কোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন সেতু নির্মাণ করা হলেও সংযোগ সড়কের অভাবে তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে স্থানীয় মানুষ ও যানবাহন তিন দশক আগে নির্মিত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি বেইলি সেতুর ওপর নির্ভর করছে। এই পুরোনো বেইলি সেতুর স্টিলের পাটাতন বিভিন্ন স্থানে ভেঙে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে স্থানীয় বাসিন্দারা বেইলি সেতুর পরিবর্তে নতুন সেতুটি হেঁটে পার হচ্ছেন। তবে নতুন সেতুতে ওঠার জন্য কোনো রাস্তা না থাকায় তাদের মই বেয়ে উঠতে হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য নতুন এক ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ত্রিশাল উপজেলার মঠবাড়ী ইউনিয়নের পোড়াবাড়ী বাজার সংলগ্ন খিরু নদীর ওপর নির্মিত এই সেতুটি ত্রিশাল ও ফুলবাড়িয়া উপজেলার মধ্যে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সেতুর পাশে স্থাপিত ফলক অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজেস’ (এসইউপিআরবি) প্রকল্পের আওতায় ৭০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৩ সালের ২৬ আগস্ট কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জমি অধিগ্রহণের জটিলতার কারণে তিন দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে মূল অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও সেতুটি অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
সেতু নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে এমসিই-এমএলএম (জেভি) নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মকবুল হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সংযোগ সড়কের জমি বুঝে না পাওয়ায় আমরা কাজ শেষ করতে পারছি না। সেতুর মূল কাজ শেষ হয়েছে। সংযোগ সড়ক তৈরি করতে না পেরে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’
ময়মনসিংহ শহর থেকে ২৯ কিলোমিটার এবং ত্রিশাল উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পোড়াবাড়ী বাজার। গত ১১ অক্টোবর সকালে সেখানে সরেজমিন দেখা যায়, নতুন পাকা সেতু ও পুরোনো বেইলি সেতুটি পাশাপাশি অবস্থান করছে। বেইলি সেতুর বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাওয়ায় বাস-ট্রাকসহ নানা যানবাহন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাচল করছে। নতুন পাকা সেতুর এক পাশে দোকানপাট এবং অপর প্রান্তে বসতবাড়ি থাকায় কোনো সংযোগ সড়ক তৈরি করা যায়নি। ফলে স্থানীয় লোকজন এক পাশে কাঠের মই বেয়ে সেতুতে উঠছেন এবং অন্য প্রান্তের সামান্য খোলা অংশ দিয়ে নেমে যাচ্ছেন।
১১ অক্টোবর সকালে ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি সেতু দিয়ে একটি ট্রাক যাওয়ার সময় পথচারীদের সতর্ক করছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. সেলিম মিয়া। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘১০-১২ বছর ধইরা আনফিট বিরিজ দিয়া ভারী গাড়ি চলতাছে। কখন যে ভাইঙ্গা পইড়া বড় দুর্ঘটনা ঘটে, সেই ডরে থাহন লাগে। নতুন বিরিজটা অইয়া রইছে, অথচ চালু অয় না।’
স্ত্রী ও নাতনিকে নিয়ে মই বেয়ে নতুন সেতুতে ওঠার পর পোড়াবাড়ী এলাকার বাসিন্দা হাসেন আলী আক্ষেপ করে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ভাঙা বিরিজ দিয়া হাঁটতে ডর লাগে, হের লাইগা মই দিয়া নতুন বিরিজে উঠি। বহুদিন ধইরা এভাবে পারাপার করতাছি। জানি না কবে এই নতুন বিরিজ চালু হইব।’
সংযোগ সড়কের কাজ কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারও কাছেই কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। পুরো বিষয়টি এখন সেতুর দুই প্রান্তে থাকা দোকান ও বসতঘরের জমি অধিগ্রহণের ওপর নির্ভর করছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ত্রিশাল উপজেলা কার্যালয়ের প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন জানান, জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ইতিমধ্যে ময়মনসিংহে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পৌঁছেছে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জমির মালিকদের দ্রুত এই টাকা পরিশোধ করা হলে ঠিকাদার সংযোগ সড়কের কাজ শুরু করতে পারবেন।
সংযোগ সড়কের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেতুটি হস্তান্তর করা সম্ভব নয় বলে এই উপজেলা প্রকৌশলী আরও জানান, পুরোনো বেইলি সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জানানো হয়েছে, যাতে দ্রুত জমি অধিগ্রহণের টাকা বুঝিয়ে দিয়ে নতুন সেতুটি পুরোপুরিভাবে চালু করা যায়।
নদী পার হয়ে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে হয় পোড়াবাড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রী নাফিজা ইসলামকে। বেইলি সেতুটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে জানিয়ে সে মুক্তকণ্ঠকে বলে, দ্রুত সংযোগ সড়ক তৈরি করে পাকা সেতুটি চালু করা না হলে যেকোনো সময় দুই উপজেলার সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।