একই আঙিনা, অথচ একপাশে ভেসে আসে আজানের পবিত্র সুর, আর অন্যপাশে উলুধ্বনি ও ঢোলের শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে পূজা-অর্চনার পরিবেশ। অবাক করা বিষয় হলো, এই দুই উপাসনালয়ের মধ্যবর্তী দেয়ালের দূরত্ব মাত্র তিন ফুট! ধর্ম আলাদা, প্রার্থনার পদ্ধতি ভিন্ন—তবুও সেখানে নেই কোনো দ্বিধা কিংবা সংঘাতের চিহ্ন। সীমান্তঘেঁষা জেলা লালমনিরহাট শহরের পুরান বাজারের কালীবাড়ি এলাকায় প্রায় দুই শতাব্দী ধরে পাশাপাশি অবস্থান করছে একটি জামে মসজিদ ও একটি কালী মন্দির। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই স্থানটি।

স্থানীয় ইতিহাস ও সূত্রে জানা গেছে, আজ থেকে প্রায় ১৮৮ বছর আগে, অর্থাৎ ১৮৩৬ সালে লালমনিরহাটের পুরান বাজার এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই কালীবাড়ি মন্দির। পরবর্তীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলিম ব্যবসায়ীরা এই এলাকায় আসতে শুরু করেন। তখন মন্দিরের পাশেই সাময়িকভাবে নামাজ পড়ার জন্য তারা একটি ছোট টিনের ঘর তৈরি করেন, যা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়ে আজকের ‘পুরান বাজার জামে মসজিদ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

শুরু থেকেই একই উঠানে পাশাপাশি অবস্থান করছে ভিন্ন দুই ধর্মের এই উপাসনালয়। সময়ের আবর্তে কাঁচা অবকাঠামো এখন পাকা হয়েছে, বদলেছে চারপাশের দৃশ্যপট, কিন্তু দুই ধর্মের মানুষের মধ্যকার বিশ্বাস ও ভালোবাসার চিরন্তন বন্ধনটি আগের মতোই অটুট রয়েছে।

কালীবাড়ি মন্দিরের পুরোহিত সুমন কুমার চক্রবর্তী বলেন, “আমরা শত বছরের বেশি সময় ধরে এখানে একসঙ্গে ধর্ম পালন করে আসছি। আজানের সময় পূজার সকল প্রকার বাদ্যযন্ত্র ও কাসর বন্ধ রাখা হয়। আবার আমাদের বিভিন্ন উৎসবে মুসলিম ভাইদের কাছ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা পাই।”

এলাকার এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা উল্লেখ করে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “এখানে দুই ধর্মের মানুষ যেভাবে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ঐতিহাসিকভাবেই এই এলাকায় চমৎকার একটি পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রয়েছে।”

জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধানের মতে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় সহনশীলতার এই চর্চা শুধু লালমনিরহাটের জন্য নয়, বরং পুরো দেশের জন্যই একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তিনি জানান, এই ঐতিহ্য রক্ষায় জেলা প্রশাসন সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে।

সম্প্রতি শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে লালমনিরহাটের কালীবাড়ি মন্দির পরিদর্শন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেন, “একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান পুরো বাংলাদেশের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। এখানে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও মেলবন্ধন দীর্ঘদিনের। যুগের পর যুগ ধরে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছেন।”

মন্ত্রী আরও বলেন, “হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে মুসলমানরা সহযোগিতা করেন। পাশাপাশি মুসলমানদের নামাজের সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও মসজিদের আশপাশে ঢাক-ঢোলসহ বিভিন্ন উৎসবের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহাবস্থানের এই চর্চা সত্যিই প্রশংসনীয়।” এসময় তিনি আশ্বস্ত করেন যে, আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও আনন্দমুখর পরিবেশে উদ্‌যাপনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করা হবে।