নিজে ধার্মিক মুসলিম, কিন্তু প্রতিবেশী অন্য ধর্মের—আমাদের দেশের সর্বত্রই এমন ঘটনা ছড়িয়ে আছে। মুসলিম বাড়ির সামনে মন্দির বা হিন্দু বাড়ির দুয়ারে মসজিদ। অনেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে–উপলক্ষে কাছাকাছি আসেন, আবার অনেকে দোদুল্যমনা থাকেন—ভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে থেকে ধর্মের খেলাপ হচ্ছে না তো? পাপ করছি না তো?
আসলেই কি তেমন কিছু? আসুন, আজ আলাপ করা যাক।
ইসলামি সমাজে একজন মানুষের সবচেয়ে কাছের মানুষ হলেন তাঁর প্রতিবেশী। প্রতিবেশীর অধিকারের ক্ষেত্রে মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে ইসলাম মৌলিক ভেদাভেদ করেনি।
অমুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে একজন মুসলিমের আচরণ কত সুন্দর হবে, তা কোরআন ও হাদিসের আলোকে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বিষয়ক ৫টি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরা হলো:
মদিনায় এক ইহুদি কিশোর নবীজিকে নানা কাজে সহযোগিতা করত। ছেলেটি একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি তাকে দেখতে তার বাড়িতে যান এবং মাথার কাছে বসে তার খোঁজখবর নেন।
ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার এতটাই বিস্তৃত যে ফেরশতা জিবরাইল (আ.) নবীজিকে এ বিষয়ে বারবার তাগিদ দিয়েছেন। নবীজি বলেছেন, ‘জিবরাইল আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে এত বলছিলেন যে আমার মনে হলো, হয়তো তিনি প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৫)
ইসলামি আইনজ্ঞরা প্রতিবেশীকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন:
ক. আত্মীয় মুসলিম প্রতিবেশী (যার অধিকার ৩টি)
খ. অনাত্মীয় মুসলিম প্রতিবেশী (যার অধিকার ২টি)
গ. অমুসলিম প্রতিবেশী, যার অন্তত একটি অধিকার রয়েছে, আর তা হলো—প্রতিবেশীর অধিকার। (আল–আসকালানি, ফাতহুল বারি , ১০/৪৪৬, দারুল মাআরিফা, বৈরুত, ১৯৬০)
প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা পবিত্র কোরআনের সরাসরি নির্দেশ। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা ইবাদত করো আল্লাহর, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক কোরো না। আর সদ্ব্যবহার করো মাতা-পিতার সঙ্গে, নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে, এতিম, মিসকিন, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথি, মুসাফির এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের সঙ্গে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩৬)
এই আয়াতে ‘দূর প্রতিবেশী’ বলতে অমুসলিম প্রতিবেশীদের বোঝানো হয়েছে। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম , ১/৪৮৮, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৪)
সুতরাং ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে যেকোনো প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করা একজন মুমিনের ধর্মীয় দায়িত্ব।
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আমরের বাড়িতে একবার একটি বকরি জবাই করা হলো। তিনি তাঁর দাসকে দুই বার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি আমাদের ইহুদি প্রতিবেশীকে গোশত দিয়েছ?’
পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হলো উপহার বিনিময়। অমুসলিম প্রতিবেশীও এই উপহার বা খাবারের অংশীদার হবেন।
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আমরের বাড়িতে একবার একটি বকরি জবাই করা হলো। তিনি তাঁর দাসকে দুই বার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি আমাদের ইহুদি প্রতিবেশীকে গোশত দিয়েছ?’ এরপর তিনি প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কিত নবীজির সেই বিখ্যাত হাদিসটি শোনান। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৪৩)
এই ঘটনা প্রমাণ করে, ভালো খাবার রান্না হলে অমুসলিম প্রতিবেশীর ঘরে তা পাঠানো সাহাবিদের সুন্নত।
অমুসলিম প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তাঁকে দেখতে যাওয়া এবং তাঁর বিপদে-আপদে সাধ্যমতো সাহায্য করা ইসলামের অন্যতম শিষ্টাচার।
মদিনায় এক ইহুদি কিশোর নবীজিকে নানা কাজে সহযোগিতা করত। ছেলেটি একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি তাকে দেখতে তার বাড়িতে যান এবং মাথার কাছে বসে তার খোঁজখবর নেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৫৬)
একইভাবে অমুসলিম প্রতিবেশী যদি কোনো আর্থিক বা সামাজিক সংকটে পড়েন, তবে একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো সবার আগে তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। (ইমাম গাজালি, ইহইয়ায়ু উলুমিদ্দিন, ২/২১২, দারুল মাআরিফা, বৈরুত, ২০০৪)
হাদিসে ‘প্রতিবেশী’ শব্দটি শর্তহীনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে; অর্থাৎ তিনি মুসলিম হোন বা অমুসলিম—তাঁকে কোনোভাবেই শারীরিক, মানসিক বা সামাজিকভাবে কষ্ট দেওয়া যাবে না।
ইসলামে কাউকে কষ্ট দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, আর প্রতিবেশী হলে তো এর ভয়াবহতা আরও বেশি। নবীজি বলেছেন, ‘যার অনিষ্ট বা ক্ষতি থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৬)
এই হাদিসে ‘প্রতিবেশী’ শব্দটি শর্তহীনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে; অর্থাৎ তিনি মুসলিম হোন বা অমুসলিম—তাঁকে কোনোভাবেই শারীরিক, মানসিক বা সামাজিকভাবে কষ্ট দেওয়া যাবে না। (মোল্লা আলী কারি, মিরকাতুল মাফাতিহ শারহু মিশকাতিল মাসাবিহ , ৮/৩১৩, দারুল ফিকর, বৈরুত, ২০০২)
অমুসলিম প্রতিবেশীর প্রাণ, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মুসলিমদের ইমানি দায়িত্ব।
অমুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে সুন্দর ও মানবিক আচরণ কেবল একটি সামাজিক শিষ্টাচারই নয়, বরং এটি ইসলামের মহানুভবতা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। আমাদের উত্তম চরিত্র ও সহমর্মিতাই পারে পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে সমাজে স্থায়ী সম্প্রীতি ও শান্তির সুবাস ছড়িয়ে দিতে।