চাকরির প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে বর্তমানে সেখানে আটকা পড়ে আছেন ১ হাজার ৮০০-এর বেশি বাংলাদেশি কর্মী। তাঁদের উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ সরকারের জরুরি সহায়তা কামনা করা হয়েছে। জানা গেছে, এই কর্মীদের সেখানে অনলাইন প্রতারণাসংক্রান্ত বিভিন্ন ‘স্ক্যাম সেন্টারে’ কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। সম্প্রতি কম্বোডিয়া সরকার দেশটিতে বিদ্যমান সব স্ক্যাম সেন্টার বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে, আর এই সুযোগেই বাংলাদেশিদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের দাবি উঠেছে।
আজ রোববার আটকে পড়া এই কর্মীদের পক্ষে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিয়েছে অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন। মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই সংগঠনটি মূলত পাচার প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাঁদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে কাজ করে থাকে। আবেদনের অনুলিপি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডেও প্রেরণ করা হয়েছে।
আবেদনে অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন উল্লেখ করেছে যে, কম্বোডিয়া সরকার সাধারণ ক্ষমার আওতায় আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে নিজ দেশে ফেরার একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এই নির্দিষ্ট সময়ের কথা মাথায় রেখে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আর কোনো বিলম্ব করা উচিত নয়। সংগঠনটির দাবি, এই সময়ের মধ্যেই আটকে পড়া ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনা নিশ্চিত করতে হবে এবং একই সঙ্গে মানব পাচারকারী চক্রের বিচার, ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন ও অভিবাসন ব্যবস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়, অনেক বাংলাদেশি কর্মী বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা এবং সরকারি ছাড়পত্র নিয়ে কর্মসংস্থানের আশায় কম্বোডিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রতিশ্রুত চাকরির বদলে তাঁদের বিভিন্ন অনলাইন স্ক্যাম কম্পাউন্ডে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। বাংলাদেশ দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, জরিমানা মওকুফের আওতায় দেশে ফেরার জন্য ১ হাজার ৭৯৭ জনের একটি তালিকা কম্বোডিয়া কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেছে। তবে নির্ধারিত সময়ে আবেদন করতে না পারায় আরও ৪০০-এর বেশি বাংলাদেশি একই ধরনের সংকটে পড়ে আছেন বলে জানা গেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, ভুক্তভোগী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, তাঁদের অনেকে প্রতারণামূলক নিয়োগ, জবরদস্তি, ভয়ভীতি, চলাচলে বাধা এবং পাসপোর্ট আটকে রাখার মতো ঘটনার শিকার হয়েছেন। এছাড়া শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং মুক্তির বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, সরকারি ছাড়পত্র ও বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিদেশে যাওয়ার পরও যদি একজন বাংলাদেশি মানব পাচারের শিকার হন, তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া, ঝুঁকি নিরূপণ এবং নাগরিক সুরক্ষাব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আটকে পড়া বাংলাদেশিদের বর্তমান আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকট বিবেচনা করে অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন সরকারের কাছে বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা, প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি সংগ্রহে সহায়তা প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে জরুরি কূটনৈতিক সমন্বয় করার দাবি জানিয়েছে। তারা আরও বলছে, যেসব ব্যক্তি বৈধ সরকারি ছাড়পত্র নিয়ে কম্বোডিয়ায় গিয়ে মানব পাচারের শিকার হয়েছেন, তাঁদের ঘটনাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করা দরকার। এর মাধ্যমে নিয়োগকর্তা যাচাই, কর্মস্থল পরিদর্শন, চাকরির চুক্তি, বেতন, আবাসন এবং গন্তব্য দেশের ঝুঁকি নিরূপণ প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটির সভাপতি আল আমিন বলেন, “বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য নাগরিকদের বৈধভাবে পাঠানোই যথেষ্ট নয়; তাঁদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো নাগরিক বিদেশে গিয়ে মানব পাচারের শিকার হলে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা, সুরক্ষা দেওয়া, পুনর্বাসন করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।”