লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন ও তার স্ত্রী চৌধুরী রুবিনা ইয়াসমিন লুবনার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের পরিচালিত অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দম্পতির নামে মোট ২ কোটি ৬২ লাখ ৫১ হাজার ২৩১ টাকার সম্পদ রয়েছে, যা তাদের বৈধ আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।

দুদকের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সাবেক সংসদ সদস্য নয়নের বিরুদ্ধে ৭৯ লাখ ৯৯ হাজার ৬৪২ টাকা এবং তার স্ত্রী রুবিনা ইয়াসমিন লুবনার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৮২ লাখ ৫১ হাজার ৫৮৯ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। চাঁদপুরের দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক কামরুল ইসলাম এই দুটি মামলার বাদী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর দুদকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাবেক সংসদ সদস্য নয়ন ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। ওই ব্রিফিংয়ে মামলার সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন দুদকের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান।

দুদকের অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট বিবরণ অনুযায়ী, নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর একটি বিশেষ অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছিল।

অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা যায়, নয়নের স্ত্রী রুবিনা ইয়াসমিন লুবনার নামে ১ কোটি ৩৭ লাখ ৮০ হাজার ৮০০ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ২৪ লাখ ৬৬ হাজার ৪০ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। সব মিলিয়ে তার নামে মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৬২ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪০ টাকা। এছাড়া পারিবারিক ও অন্যান্য খাতে ২০ লাখ ৪ হাজার ৭৪৯ টাকা ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। সম্পদ ও ব্যয় মিলিয়ে তার মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৮২ লাখ ৫১ হাজার ৫৮৯ টাকা।

দুদকের অভিযোগ, এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের বিপরীতে লুবনার নামে কোনো গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে যে, এই সম্পদগুলো তার স্বামী নয়নের অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের সাহায্যে গড়ে তোলা হয়েছে। স্বামীর পক্ষে এসব সম্পদের মালিকানা অর্জন এবং তা ভোগদখলে রাখার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে।

অন্যদিকে, নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের নামে ৩৩ লাখ ১৪ হাজার ১৩১ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ১ কোটি ২৪ লাখ ৯৬ হাজার ১৯৪ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে তার নামে মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৫৮ লাখ ১০ হাজার ৩২৫ টাকা। এর পাশাপাশি পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় বাবদ ১ কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার ২৫৪ টাকা ব্যয়ের হিসাব পাওয়া গেছে।

দুদকের হিসাব অনুযায়ী, সম্পদ ও ব্যয় মিলিয়ে নয়নের মোট অর্থের পরিমাণ ২ কোটি ৭৩ লাখ ৬৭ হাজার ৫৭৯ টাকা। এর বিপরীতে দায়-ঋণসহ বিভিন্ন খাত থেকে তার গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া গেছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৬৭ হাজার ৯৩৭ টাকা। ফলে তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৯ লাখ ৯৯ হাজার ৬৪২ টাকা।

দুদকের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নয়ন এই সম্পদ অর্জন করেছেন এবং তা ভোগদখলে রেখেছেন।

নয়নের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে, তার স্ত্রী রুবিনা ইয়াসমিন লুবনার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা এবং দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন ও তার স্ত্রী বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার নিউ মডেল টাউনে অবস্থান করছেন। তবে তাদের বর্তমান অবস্থান স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পলাতক থাকায় এই অভিযোগের বিষয়ে নয়ন ও তার স্ত্রীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।