পিরোজপুরের জিয়ানগরে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সবকিছু হারিয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা সোলাইমান হোসেন। দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তার একমাত্র আয়ের উৎস খাবার হোটেলটি। এই হোটেলের আয়েই চলত সোলাইমানের পড়াশোনা এবং তার পরিবারের আট সদস্যের ভরণপোষণ। সোলাইমান স্থানীয় সরকারি ইন্দুরকানী ডিগ্রি কলেজের একজন শিক্ষার্থী।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, আগুনের তাণ্ডবে সোলাইমানের হোটেলের পাশাপাশি কামাল হোসাইনের একটি ওষুধের দোকানও পুড়ে গেছে। এছাড়া পাশের সাবিনা আক্তারের বসতঘরের একাংশ আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গত শনিবার রাত ২টার দিকে উপজেলার ঘোষেরহাট বাজারে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে রোববার (১৮ অক্টোবর) পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী এবং জিয়ানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. ওয়ালিউর রহমান রুবেল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, রাত আড়াইটার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে কয়েকজন ঘুম থেকে জেগে আগুন দেখতে পান। তাদের চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন দ্রুত ছুটে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের খবর দেওয়া হলে তারা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে ততক্ষণে খাবার হোটেলটি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং ওষুধের দোকানটির অর্ধেক অংশ পুড়ে যায়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক কারণে এর আগেও ওই হোটেলে একাধিকবার অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল।

ভুক্তভোগী সোলাইমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “খাবার হোটেলের আয় দিয়ে আমার পড়াশোনা ও পরিবারের খরচ চালাতাম। দুর্বৃত্তরা এর আগেও পাঁচ-ছয়বার আগুন লাগিয়েছিল, কিন্তু সফল হতে পারেনি। হোটেলে থাকা নগদ টাকা ও ফ্রিজসহ সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমার একমাত্র সম্বল ছিল এটি। আমি এখন কী করব, বুঝে উঠতে পারছি না।”

ক্ষতিগ্রস্ত মো. কামাল হোসাইন জানান, “আমার দোকানের অধিকাংশ ওষুধ পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো সহযোগিতা পেলে ব্যবসাটি পুনরায় শুরু করতে পারব।”

প্রত্যক্ষদর্শী সাবিনা আক্তার বলেন, “রাত ২টার পর হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে ঘরের দরজা খুলে দেখি, দোকানে আগুন লেগেছে। সেই আগুন আমাদের ঘরেও ছড়িয়ে পড়ে। পরে আমি ও আমার পরিবারের চার-পাঁচজন মিলে পানি দিয়ে আগুন নেভাতে সক্ষম হই। আমি ভয়ে আছি, আবারও যদি কেউ এভাবে আগুন লাগিয়ে দেয়। আমরা জীবনের নিরাপত্তা চাই।”

ঘোষেরহাট বাজারের ব্যবসায়ী মো. আল আমিন জানান, ৫ আগস্টের পর থেকে তাদের বাজারের কোনো কার্যকর কমিটি নেই, যার ফলে বাজারটি অভিভাবকহীন অবস্থায় চলছে। এছাড়া বাজারের সিসি ক্যামেরাগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে। তিনি আরও জানান, রাস্তার দুই পাশে টং দোকান এবং উপরে শামিয়ানা টাঙানো থাকায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে সমস্যা হয়।

তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, “এই বাজারে কিছুদিন আগে একটি দোকান পরিকল্পিতভাবে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ আবার সোলাইমানের দোকানটি পুড়িয়ে দেওয়া হলো। এই দোকানটিতে এর আগে চারবার আগুন লাগানো হয়েছিল। দোকানটির ওপর পেট্রল ঢেলে আগুন লাগানো হয়েছে, আমরা সেই গন্ধ পেয়েছি। এটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলা যায়। ছেলেটির বাবা ছোটবেলায় মারা গেছেন। পরিবারের সব খরচ তাকেই চালাতে হয়। দুর্বৃত্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”

জিয়ানগর উপজেলা ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ (ভারপ্রাপ্ত) নুরুজ্জামান শরিফ জানান, খবর পেয়ে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভাতে সক্ষম হন। তবে দোকানের সামনে টুল ও অন্যান্য বাধা থাকায় গাড়ি নিয়ে পৌঁছাতে কিছুটা বিলম্ব হয়। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ তদন্তের পর জানানো যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জিয়ানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. ওয়ালিউর রহমান রুবেল বলেন, “খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো ঘটনাস্থলে আসতে পারছিল না। বাজারের রাস্তাগুলো সরু। রাস্তার দুই পাশে কিছু অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। এগুলো আমরা পরে এসে উচ্ছেদ করব। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করছি। সোলাইমানসহ ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।”

এদিকে জিয়ানগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহব্বত খান জানিয়েছেন, এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।