মুখোশ পরিহিত একদল বিক্ষোভকারীর লাগানো আগুনে লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক সিটি হল ভবনটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। উল্লেখ্য, দুটি বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা কাটিয়ে প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল এই স্থাপত্যটি।

স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা মরিস বারাত বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের অগ্নিসংযোগের ফলে সিটি হলের পশ্চিম অংশটি বাদে পুরো ছাদটি ধসে পড়েছে। এছাড়া ভবনের বাইরের অংশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে।

১৪৩ বছরের পুরনো এই স্থাপনার এমন ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিকে ‘ঐতিহ্যের জন্য বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছেন মরিস বারাত। তিনি এই ঘটনাকে ‘দুষ্কৃতকারীদের ইচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ড’ বলে বর্ণনা করে তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেন।

শত শত মানুষ নিজেদের চোখের সামনেই সিটি হলটি আগুনে পুড়ে ছাই হতে দেখেছেন। ভবনটিতে যখন আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন স্থানীয় কাউন্সিলরকে দেখা যায় এক পৌরকর্মীকে সান্ত্বনা দিতে, যিনি নিজের কর্মস্থল আগুনে পুড়তে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে চলমান বিক্ষোভের অংশ হিসেবে গত শনিবার লিমোজ সিটি হলে এই অগ্নিসংযোগ করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, প্রথমে সিটি হলের বাইরে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এরপর মুখোশধারী একদল বিক্ষোভকারী ভবনের জানালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আগুন ধরিয়ে দেয়। শনিবার গভীর রাত পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। এই সময়ে শত শত মানুষ সিটি হলটি আগুনে পুড়ে যেতে দেখেছেন। ভবনটিতে যখন আগুন জ্বলছিল, তখন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন স্থানীয় কাউন্সিলর এক পৌরকর্মীকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। ভবন আগুনে পুড়ছে দেখে ওই কর্মী কাঁদছিলেন।

বিক্ষোভ চলাকালীন লিমোজ শহরের কেন্দ্রস্থলের বেশ কিছু দোকানেও লুটতরাজ চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

মূলত জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নানা সংকট এবং সরকারি সেবার মান হ্রাস পাওয়ার প্রতিবাদে গত শনিবার ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রান্তে লাখো মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

ফরাসি সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দেশজুড়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন এবং এই সময় অন্তত ১ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নিয়োজিত সংগঠন সিজিটি ইউনিয়ন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, তাদের ধারণা এদিন প্রায় ৮ লাখ মানুষ বিক্ষোভ করেছেন।

প্যারিসে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্ষোভকারী ও দাঙ্গা পুলিশের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ চলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। একপর্যায়ে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। বেশ কিছু দোকানে লুটপাট চালানো হয় এবং অন্তত একটি রেস্তোরাঁ আগুনে পুড়ে যায়।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মুখোশধারী কিছু ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে লুটপাটের চেষ্টা চালিয়েছে। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেয়। সরকারি ভবন ও সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়েও হামলা চালানো হয়েছে। সরকার এই অস্থিরতার জন্য ‘উগ্র বামপন্থীদের’ দায়ী করেছে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানিয়েছেন, এই সহিংসতায় ১৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তিনি বলেন, পুলিশকে ‘চরম মাত্রার সহিংসতার’ মুখোমুখি হতে হয়েছে।

অন্যদিকে, লিওঁ শহরে বিক্ষোভকারীরা একটি পর্যটন কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বলে জানা গেছে।