গাড়ি থেকে নামামাত্রই আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার—পাশ থেকে একজন বলছেন, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’ মাদকবিরোধী অভিযানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের এমন কর্মকাণ্ডে তাঁর নিজ দল বিএনপি এবং সরকারের ভেতরে তীব্র অস্বস্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। মন্ত্রিসভার সদস্য থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অনেকেই এই ঘটনায় বিব্রত বলে জানিয়েছেন। তাঁদের মৌলিক প্রশ্ন হলো, মাদক দমনে প্রশাসনকে সক্রিয় করার পরিবর্তে একজন প্রতিমন্ত্রী নিজেই কেন অস্ত্র হাতে অভিযানে নামলেন?

ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকা পরিদর্শন করছিলেন। দল ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাংশের মতে, প্রধানমন্ত্রীর দিনভর পরিদর্শনের ইতিবাচক আলোচনা ইশরাকের এই কর্মকাণ্ডের কারণে অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার মতে, একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণের দায়ভার মন্ত্রিসভাকেও নিতে হবে।

এই বিষয়ে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। মাদকের বিরুদ্ধে উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই, তবে প্রতিমন্ত্রীর অভিযান পরিচালনার ধরন নিয়ে তাঁরা তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ঘটনাটি শুধু ইশরাকের ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে থাকেনি; প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদেরও বিব্রত করেছে। একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণের দায় মন্ত্রিসভাকেও নিতে হবে।”

এদিকে, অস্ত্র হাতে ইশরাকের এই অভিযানের ঘটনাটি তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। আজ রোববার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে এই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, আইনের কোনো ব্যত্যয় পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে ইশরাক হোসেন নিজের এই কর্মকাণ্ডকে মাদকের বিরুদ্ধে ‘সামাজিক প্রতিরোধের’ অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আজ এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, হামলার আশঙ্কায় আত্মরক্ষার জন্য তিনি অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন। তাঁর দাবি, তাঁর হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত।

ঠিক কী ঘটেছিল সেই অভিযানে?
গত শনিবার বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন সংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘণ্টি ঘর রেলগেট এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটে। ইশরাকের নিজস্ব ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করছেন। তাঁর পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’ ভিডিওতে দেখা যায়, সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা রেললাইনের পাশে কয়েকজনকে ধরতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এবং একপর্যায়ে ইশরাকের একজন দেহরক্ষী এক তরুণকে লাথি মারেন।

এই দৃশ্য নিয়েই আপত্তি তুলেছেন বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার এক শীর্ষ নেতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নামা সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কাজ নয়। তাঁদের কাজ প্রশাসনকে সহযোগিতা করা।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘যেটা যার কাজ না, সেটা সে কেন করবে?’ এই নেতার মতে, এই ঘটনার ফলে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।

ইশরাক শনিবার নিজের এই উদ্যোগের পক্ষে স্থানীয় মানুষের অভিযোগ এবং ওই এলাকায় মাদকের বিস্তারের কথা উল্লেখ করেন। পুলিশের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা বলে তিনি জানান, জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তবে দল ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, উদ্দেশ্য ভালো হলেও প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড পুরো উদ্যোগটিকে বিতর্কিত করে তুলেছে। এখন মাদক দমনের চেয়ে তাঁর অস্ত্র প্রদর্শন এবং সহযোগীদের আচরণ নিয়ে আলোচনা বেশি হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের দিনে বিতর্ক
শনিবার সকাল ৯টা ১০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৪১ মিনিট পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টায় তিনি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা এবং মিরপুর-১০ নম্বরের হকারমুক্ত ফুটপাতসহ মোট ১৩টি স্থান ঘুরে দেখেন। পরিচ্ছন্নতা ও সেবার মান যাচাই করে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন এবং পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সাত দিন থেকে দুই সপ্তাহের সময় বেঁধে দেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই পরিদর্শনে থাকা মন্ত্রিসভার একজন সদস্য শনিবার রাতে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দিনভর অর্জন ইশরাকের কর্মকাণ্ডে নষ্ট হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এই ঘটনায় তিনি নিজেও অত্যন্ত বিব্রত ও বিরক্ত।

একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি রোববার সকালে মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে ইশরাকের উদ্দেশ্য ঠিক আছে। কিন্তু তিনি এত বেপরোয়া হয়ে গেলেন কেন, সেটাই প্রশ্ন। তাঁর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে শনিবার প্রধানমন্ত্রীর চমৎকার কর্মসূচিটি নষ্ট হয়ে গেছে।”

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ওই শীর্ষ নেতাও একই কথা বলেছেন। ‘দুধে এক ফোঁটা চোনা’ পড়ার উপমা দিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দিনভর অর্জনের ওপর ইশরাকের কর্মকাণ্ড একই ধরনের প্রভাব ফেলেছে। তাঁর মতে, সরকারের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মধ্যে একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণ পুরো মন্ত্রিসভাকে বিব্রত করেছে।

ইশরাকের আত্মপক্ষ সমর্থন
সমালোচনার মুখে আজ রোববার এক বিবৃতিতে ইশরাক দাবি করেন, একটি অস্থায়ী মাদক আস্তানার কাছে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি হইচই করে তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। তিনি বলেন, হামলার আশঙ্কায় তিনি ও তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তা সরিয়ে নেওয়া হয়।

বিবৃতিতে তিনি স্থানীয়ভাবে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে আগে নেওয়া উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্যমতে, সংশ্লিষ্ট এলাকায় স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং জনবলসংকট দূর করার বিষয়ে তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন। পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক-সামাজিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তিনি এই সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন।

তবে ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি অস্পষ্ট। ইশরাক আগে পুলিশের সঙ্গে আলোচনার কথা বললেও শনিবার সংবাদমাধ্যমকে তিনি নিজেই বলেছিলেন, ঘটনাস্থলে যাওয়ার ১০ মিনিট পর তিনি পুলিশকে আসতে বলেন। ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা শনিবার সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, প্রতিমন্ত্রী আগে থেকে পুলিশকে জানাননি, তাঁরা পরে বিষয়টি জানতে পেরেছেন। ফলে নির্দিষ্ট এই অভিযানের বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে আগে থেকে কোনো সমন্বয় ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্রটি বৈধ কি না, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি এটি প্রদর্শনের ধরন নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালায় আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র বহন ও ব্যবহারের অনুমতির পাশাপাশি প্রদর্শনের সীমাও নির্ধারণ করা আছে। নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অন্যের মধ্যে ভয় বা বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না। পুলিশ এখন তদন্ত করে দেখবে ইশরাকের ঘটনায় আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়েছে কি না। ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, তদন্তের ফল অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দল ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আইনি প্রশ্নের পাশাপাশি মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণের বিষয়টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের বক্তব্য, মাদক দমনে প্রশাসনের ঘাটতি থাকলে তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ প্রতিমন্ত্রীর আছে, কিন্তু নিজে অস্ত্র হাতে অভিযানে যাওয়ায় প্রশাসনের ঘাটতির পাশাপাশি তাঁর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

কূটনীতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ
ইশরাক বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটিরও সদস্য। তাঁর অস্ত্র হাতে অভিযানের ছবি ও ভিডিও বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে দল ও সরকার সম্পর্কে কী ধারণা তৈরি করবে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় তা ঢাকার দূতাবাসগুলোর নজরে এসেছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর আশঙ্কা, মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের এমন ছবি কূটনীতিকেরা নেতিবাচকভাবেই দেখবেন।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার পাশাপাশি ইশরাককে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলছেন অনেকে। এর মধ্যেই শনিবার সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক পেজে ঢাকা-৬ আসন মাদকমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, মাদক কারবারে নিজের দলের কেউ জড়িত থাকলেও তাঁকে ছাড় দেওয়া হবে না।

তবে দল ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নেওয়া এক বিষয় নয়। পুলিশের তদন্তে অস্ত্র প্রদর্শনের আইনগত দিকটি যাচাই হবে, তবে একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন কর্মকাণ্ডে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের কেউ কেউ এই ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থার প্রত্যাশা করছেন।