পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কিংবদন্তি ক্রিকেটার ইমরান খানকে কেন্দ্র করে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কের প্রভাব কি এবার ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকক্ষেও এসে পৌঁছাল? ইংল্যান্ডের সাবেক দুই অধিনায়ক মাইকেল আথারটন ও নাসের হুসেইনের অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে এখন এই প্রশ্নটি জোরালো হচ্ছে। পাকিস্তান, ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজের ধারাভাষ্যকারদের তালিকায় জায়গা হয়নি তাঁদের দুজনের।
গতকাল শনিবার পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) এই সিরিজের জন্য ছয় সদস্যের একটি ধারাভাষ্য প্যানেল ঘোষণা করেছে। তবে সেই তালিকায় আথারটন ও হুসেইনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। উল্লেখ্য, বিশ্ব ক্রিকেটের অত্যন্ত জনপ্রিয় এই দুই ধারাভাষ্যকার ইংল্যান্ডের প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই নিয়মিত ধারাভাষ্যকক্ষে উপস্থিত থাকেন। এমনকি ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইংল্যান্ডের সর্বশেষ পাকিস্তান সফরের সময় তিন টেস্টের সিরিজেও তাঁরা ধারাভাষ্য প্যানেলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
পিসিবি এখন পর্যন্ত তাঁদের বাদ পড়ার নির্দিষ্ট কোনো কারণ সামনে আনেনি। তবে গত আগস্টে কারাবন্দী ইমরান খানের দুই পুত্র কাসিম ও সুলাইমান খানের সাক্ষাৎকার গ্রহণকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানে যে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, বর্তমান সিদ্ধান্তের সঙ্গে তার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে।
পুরো বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের মধ্যকার লর্ডস টেস্ট চলাকালীন। সেই সময়ে স্কাই স্পোর্টস ইমরান খানের দুই ছেলের একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রচার করে। দীর্ঘ ১৮ মিনিটের সেই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন মাইকেল আথারটন। সেখানে কাসিম ও সুলাইমান তাঁদের বাবার কারাগারে শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সাক্ষাৎকারে তাঁদের অভিযোগ ছিল, “অবহেলা ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় রেখে পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ তাঁদের বাবাকে ‘স্পষ্টতই মেরে ফেলার চেষ্টা করছে’।”
এই সাক্ষাৎকারটি পিসিবি মোটেও ভালোভাবে নেয়নি। ক্রিকেট সম্প্রচারের প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক বিষয় উত্থাপন করার অভিযোগে স্কাই স্পোর্টসের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল যে, প্রতিবাদ হিসেবে পাকিস্তান দলকে মাঠে না নামানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। এমনকি টেস্ট ম্যাচের মধ্যাহ্নবিরতির পরবর্তী সেশনে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের মাঠে না পাঠানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছিল বলে জানা যায়।
এত চাপ ও হুমকির মুখেও স্কাই স্পোর্টস সাক্ষাৎকারটি প্রচার করে। তবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম পিটিভি এই সাক্ষাৎকারটির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়।
পরবর্তীতে নাসের হুসেইনের সঙ্গে একটি পডকাস্টে এই পুরো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন আথারটন। ইমরান খানের ছেলেদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে তিনি অভিযোগ করেন যে, পাকিস্তান রাষ্ট্র যেন ইমরান খানকে “অস্তিত্ব থেকেই প্রায় মুছে ফেলার চেষ্টা করছে”।
সেই বিতর্কের ঠিক দুই মাস পর এখন পাকিস্তানে আয়োজিত ত্রিদেশীয় সিরিজের ধারাভাষ্য প্যানেলে নেই আথারটন ও হুসেইন। যদিও তাঁদের এই অনুপস্থিতির সঙ্গে ওই সাক্ষাৎকারের সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এর আগে গত আগস্টে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ২১ জন সাবেক অধিনায়ক পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে ইমরান খানের উন্নত চিকিৎসা এবং মানবিক আচরণের দাবি জানানো হয়েছিল। সেই ২১ জনের তালিকায় আথারটন ও হুসেইনও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
পিসিবি ঘোষিত ছয় সদস্যের ধারাভাষ্য প্যানেলে রয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক চার ক্রিকেটার ওয়াকার ইউনিস, আমির সোহেল, বাজিদ খান ও উরুজ মুমতাজ। তাঁদের পাশাপাশি থাকছেন শ্রীলঙ্কার রোশান আবেসিংহে এবং ইংল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার মার্ক বুচার। পুরো আয়োজনের উপস্থাপকের দায়িত্ব পালন করবেন জয়নব আব্বাস।
আজ পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার ম্যাচের মাধ্যমে ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজ শুরু হয়েছে। তবে প্রথম ম্যাচে ধারাভাষ্যকক্ষে থাকছেন না ওয়াকার ইউনিস। ২০ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তান ও ইংল্যান্ডের ম্যাচ থেকে তিনি তাঁর ধারাভাষ্য শুরু করবেন। ২২ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডিতেই মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা। এরপর টুর্নামেন্টটি লাহোরে স্থানান্তরিত হবে। গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ২৫, ২৭ ও ২৯ অক্টোবর লিগ পর্বের বাকি তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। একই মাঠে ৩১ অক্টোবর ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। লিগ পর্বের পয়েন্ট তালিকায় শীর্ষ দুই দল শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে লড়াই করবে।