বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেছেন, তাঁদেরকে বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করা হলেও তাঁরা তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, “ইনিয়ে-বিনিয়ে বহু লোভ-লালসা আমাদের দেখানো হয়েছে। এসবের দিকে ফিরেও তাকাইনি, ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি।”

রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আমার বাংলাদেশ (এবি পার্টি) আয়োজিত ‘জুলাই সনদের এক বছর’ শীর্ষক এক মুক্ত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করে বলেন, “কথা দিচ্ছি, যে কেউ তার ইচ্ছা জাতির সাথে প্রতারণা করুক, বিরোধী দল হিমালয় পর্বতের মতো অটল থেকে লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাবে।”

বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী শাসন যে পথে চলেছিল, বর্তমান বিএনপি সরকারও ঠিক সেই একই পথে হাঁটছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিরোধী দল কি কেবল দর্শক হয়ে বসে থাকবে? ডা. শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন, শত ইঞ্জিনিয়ারিং ও কারচুপির পর জনগণ তাঁদের যে কয়টি আসন দিয়েছে, সেই আসনের ৮৯ জন এমপি দেশের ১৮ কোটি মানুষের পাহারাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

বিএনপির ভূমিকা নিয়ে কথা বলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “বিএনপি ৫ আগস্ট পর্যন্ত মজলুম ছিল, কিন্তু এরপর তারা দ্রুত অতীতের কথা ভুলে গেছে।” তাঁর মতে, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “বিএনপি বদলে গেলেও আমরা বদলাব না। জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়ন করেই ছাড়ব।” তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সরকার বিরোধী দলের সহযোগিতার যোগ্য নয়; এখন থেকে বিরোধী দল সরকারের পরিবর্তে সরাসরি ১৮ কোটি মানুষের পাশে দাঁড়াবে।

আন্দোলনের লক্ষ্য ব্যাখ্যা করে জামায়াত আমির বলেন, জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা, ফ্যাসিবাদের পথ রুদ্ধ করা, বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা, মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য দেশ গড়াই তাঁদের আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য।

তিনি আরও জানান, আন্দোলনের পথে কোনো ধরনের চক্রান্তের পরোয়া করবেন না তাঁরা। তবে দেশের প্রতি ভালোবাসার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের কর্মসূচি নয়। আমাদের সন্তানরা ২৪-এ দেখিয়ে দিয়েছে জ্বালাও-পোড়াও লাগে না, খালি হাতে ইমানি বল, দেশপ্রেম বুকে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেলেই ফ্যাসিবাদের পতন হয়।”

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। পাশাপাশি বিরোধী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বঞ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য একটি অপরাধ বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, এই লড়াই কেবল ১১ দলের নয়, বরং ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূইয়ার সঞ্চালনায় এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, সরকারের মুখে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা শুনে জাতি এখন বিরক্ত। সরকার এত দ্রুত প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবে, তা কল্পনা করা সম্ভব ছিল না। তিনি মনে করিয়ে দেন, বিএনপি নিজেই দাবি করেছে যে জুলাই বিপ্লবে তাদের ৮৪৮ জন কর্মী শহীদ হয়েছেন। তাই শহীদদের রক্ত ও জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সরকারের উচিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা।

তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা জাতির সাথে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার যে পরিণতি ভোগ করেছেন, বিএনপিরও সেই ভুল করা উচিত হবে না। জুলাই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব ও সাত দফা অঙ্গীকার রয়েছে, যার অনেকগুলোই বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অথচ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির আচরণ এমন, যেন জুলাই সনদ তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।