পুলিশের দীর্ঘ চেষ্টার পর অবশেষে আদালতের মাধ্যমে ধরা পড়লেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী এবং ‘কিশোর গ্যাং নেতা’ ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা। আজ রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মহিদুল ইসলামের আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন জানান তিনি। তবে আদালত তাঁর জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

নগর পুলিশের উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) হাসান ইকবাল চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে জানান, ‘চাঁদাবাজির একটি মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন আসামি ওয়াকিল। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছেন।’

জানা গেছে, ওয়াকিল নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তবে দলীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার কারণে গত ৮ জুন তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজি এবং ভূমি দখলসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগে মোট ২৩টি মামলা রয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে, ওয়াকিল একাধিক কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করেন এবং দলীয় প্রভাব খাটিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন।

একাধিক মামলায় অভিযুক্ত হওয়ায় পুলিশ দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর খোঁজ করছিল। সর্বশেষ ৬ অক্টোবর চট্টগ্রামের টাইগার পাস এলাকার নগর ভবনে ওয়াকিলের অবস্থান থাকার খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়, কিন্তু তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরদিন সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন জানান, ওয়াকিল তখন নগর ভবনে ছিলেন না, তবে তাঁর দুই ভাই দেখা করতে এসেছিলেন।

মেয়র শাহাদাত হোসেন ওয়াকিলকে সন্ত্রাসী হিসেবে নয়, বরং ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে দাবি করেন। সেই সময় তিনি খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। এর পরপরই আবদুর রহিমকে খুলশী থানা থেকে সরিয়ে নগর পুলিশের সিটিএসবিতে এবং পরবর্তীতে খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে বদলি করা হয়।

মেয়র শাহাদাত হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশ নগর ভবনে ওয়াকিলকে ধরতে আসেনি, আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিল। ওয়াকিল ওখানে ছিল না। দলের দুঃসময়ে মিছিল সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন ওয়াকিল। কেউ অপরাধ করে থাকলে পুলিশ ব্যবস্থা নিক। গ্রেপ্তার করুক। আমি কোনো আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছি না।’

উল্লেখ্য, গত ২৯ আগস্ট পাহাড়তলী কলেজের অস্থায়ী শিক্ষক মিজানুর রহমানকে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগে খুলশী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়, যেখানে ওয়াকিল আসামি ছিলেন। ওই মামলাটি গ্রহণ করার কারণে ওসি আবদুর রহিমকে ‘আওয়ামী লীগ’ আখ্যা দিয়ে তাঁকে পেটানোর হুমকি দেওয়ার অভিযোগে ওসি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

এরপর ৪ সেপ্টেম্বর সকালে ওয়াকিলকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ওসি আবদুর রহিমসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন এবং পুলিশের একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনায় ওয়াকিলকে প্রধান আসামি করে ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করে পুলিশ মামলা করে।

অন্যদিকে, পুলিশের ওই অভিযানের প্রেক্ষিতে ওসি আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন ওয়াকিলের বাবা। ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়, ৪ সেপ্টেম্বর ভোরে পুলিশ তাঁদের বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর, লুটপাট এবং পরিবারের সদস্যদের মারধর করেছে, যার ফলে প্রায় ১৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে সিআইডি (সিআইডি) মামলাটি তদন্ত করছে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর ওয়্যারলেস কলোনিতে কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষ—সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টারের বিরোধে হৃদয় নামে একজন নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের মামলায়ও ওয়াকিল আসামি। স্থানীয়দের মতে, ওয়াকিলের নেতৃত্বাধীন সেভেন স্টার এবং খুলশী থানা যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ফাইভ স্টারের দ্বন্দ্বের কারণেই এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

সবশেষে ৬ অক্টোবর প্লট দখল, চাঁদাবাজি ও অপহরণের অভিযোগে ওয়াকিলসহ ৩৭ জনের নাম উল্লেখ করে খুলশী থানায় আরেকটি মামলা করা হয়। এতে অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত আফলাতুনের ছেলে এবং চট্টগ্রাম খবরের সম্পাদক ও প্রকাশক শেখ মুহাম্মদ আরিফ এই মামলাটি দায়ের করেন।

মামলার এজাহারে বাদী পাঁচটি পৃথক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ১১ ফেব্রুয়ারি ও ২৫ এপ্রিল তাঁকে অপহরণ করে ওয়াকিলের আস্তানায় নিয়ে গিয়ে চাঁদা দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। শেখ মুহাম্মদ আরিফের করা এই মামলায় আজ আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন জানিয়েছিলেন ওয়াকিল, যা আদালত নামঞ্জুর করেন। তবে ওয়াকিলের ভাই এবং নগর ছাত্রদলের সদস্য রকি হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য একটি পক্ষ তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।