কক্সবাজারের পাটোয়ারটেক এলাকায় ইনানী বিচের পাশে ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে’ পরিবার নিয়ে অবকাশযাপনের জন্য উঠেছিলেন যশোরের মণিরামপুরের বাসিন্দা নাহিদুর রহমান (৪১)। আজ রোববার (১৮ অক্টোবর) তাদের চেকআউটের কথা ছিল। কিন্তু এর আগেই গতকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে যায় রিসোর্টটি। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই নিখোঁজ রয়েছেন নাহিদুর রহমান, তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬) এবং তাদের দুই শিশুকন্যা রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানা (৩)।
এদিকে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। স্বজনদের দেওয়া তথ্য মতে, এর মধ্যে কয়েকটি মরদেহের বিপরীতে দাবিদার পাওয়া গেছে এবং সেই সূত্রে ১০টি মরদেহের নাম-পরিচয়ের সম্ভাব্য একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। তবে মৃতদের মধ্যে নাহিদুর রহমানের পরিবারের চার সদস্য রয়েছেন কি না, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত হতে এখন ডিএনএ পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে। তবে নাহিদুর রহমানের স্বজনেরা তাদের খোঁজ না পেয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।
নিখোঁজ নাহিদুর রহমান ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি রাজধানীর মিরপুরের শ্যাওড়াপাড়ায় বসবাস করেন।
নিখোঁজ নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স মণিরামপুর পৌরশহরে বসবাস করেন। তিনি পরিবারসহ তার ভাই নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ভাই ও তার পরিবারের সদস্যদের খোঁজ নিতে তিনি কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান বলেন, নাহিদুর ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত কক্সবাজারের ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে একটি কক্ষ বুকিং দিয়েছিল। ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টায় তাদের রিসোর্ট ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। শুক্রবার কক্সবাজার যাওয়ার কথা আমাদের জানিয়েছিল। শনিবার রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের খবরের পর নাহিদুরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। কিন্তু তার ও পরিবারের অন্য সদস্যদের মোবাইল ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। ঘটনার পর থেকে তাদের খোঁজ নেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু খোঁজ পাচ্ছি না।
জাহিদুর রহমান আরও বলেন, আমরা দুই ভাই। মা নেই, অসুস্থ বাবা আমাদের সঙ্গে গ্রামে থাকেন। বাবা এখনো নাহিদুরের ঘটনার কথা জানেন না। নাহিদুর স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় থাকত। ছুটি পেলে বা উৎসবের সময় গ্রামে আসত। তারা বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে কিছুই নিশ্চিত হতে পারছি না। আমরা খুবই উদ্বেগের মধ্যে আছি।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ফিরোজ কবির বলেন, ১০টি মরদেহের দাবিদার হিসেবে একাধিক পরিবার সামনে এসেছে। আগুনে মরদেহগুলোর মুখমণ্ডল পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে দাবিদার পরিবারগুলোর সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহগুলো সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এছাড়া কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আমাদের জানা মতে কেউ নিখোঁজ নেই। মরদেহগুলো পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। আমরা উদ্ধার অভিযান গতকাল বিকেলেই সমাপ্ত ঘোষণা করেছি। সর্বশেষ যে চারজনকে উদ্ধার করেছি সেখানে দুটি শিশু ছিল।
প্রসঙ্গত, টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। গত জুন মাসে এ বিষয়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিল ফায়ার সার্ভিস। অগ্নিকাণ্ডের দিন রিসোর্টে ৬টি রুমে ১৬ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্য থেকে ৫ থেকে ৬ জনের মতো সকালে বেরিয়ে ছিলেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানান, চলতি বছরের জনু মাসে এই রিসোর্টটিকে অগ্নিনিরাপত্তার সতর্ক করা হয়েছিল কারণ কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স ছিল না। এই রিসোর্টের নিচে রান্নাঘর ছিল। এর ওপরে ছিল আবাসিক ব্যবস্থা। সেখান থেকেই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ মরদেহের পাওয়া সম্ভাব্য নাম-পরিচয় হলো- ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির মেলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), নাফিজের বড় বোন ফারিয়া কবির (৩৩), তার পাঁচ বছর বয়সী ভাগ্নে ফায়িজান আহম্মেদ, ঢাকার সাভারের ‘স্বপ্নবিলাস স্কুল’ নামের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. নাফিস তেহামী, জিহাদ হাওলাদার ও তারিকুল ইসলাম।