১৫ বছর আগে মাকে হারানোর পর বাবার সাথেই জীবন কাটছিল তাসমিয়া মারজান শবনমের। সেই বাবাই ছিলেন তাঁর জীবনের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু গত শুক্রবার এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় সেই আশ্রয়টুকুও হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন ২৮ বছর বয়সী তাসমিয়া। স্বজনদের সব সান্ত্বনা চেষ্টা সত্ত্বেও থামছে না তাঁর শোকাতুর কান্না।

সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মোশাররফ হোসেনের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার পশ্চিম দেওভোগ গ্রামে। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার সামলেছিলেন তিনি। বড় মেয়ে সারিকা আজমির বিন্দু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে তাসমিয়া মারজান শবনমকে নিয়ে রাজধানীর বনানীতে ভাড়া বাসায় থাকতেন মোশাররফ হোসেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি চোখেও ভালোভাবে দেখতেন না।

গত শুক্রবার সকালে রাজধানীর অফিসার্স ক্লাবের নির্মাণাধীন ভবনের নিচতলায় সিঁড়ির পাশ থেকে রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয় মোশাররফ হোসেনকে। উদ্ধার করে প্রথমে তাঁকে শাহবাগের বারডেম হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে দিবাগত রাত পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনাটি সম্পর্কে রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াছিন মিয়া গতকাল শনিবার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রাথমিক তদন্তে মোশাররফ হোসেনের মৃত্যুর ঘটনাটি দুর্ঘটনাজনিত বলে মনে হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেছেন মোশাররফ হোসেনের ভাই মোতাহার হোসেন। স্বজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের অনুমতি নিয়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

মোশাররফ হোসেনের ভগ্নিপতি জাকির হোসেন মুক্তকণ্ঠকে জানান, তাঁর স্ত্রীর বড় ভাই মোশাররফ হোসেনের স্ত্রী ১৫ বছর আগে মারা যান। এরপর দুই মেয়েকে নিয়ে তিনি রাজধানীর বনানীর ৫ নম্বর সড়কের একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন। কয়েক বছর আগে বড় মেয়ে সারিকা আজমির যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং সেখানে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট মেয়ে তাসমিয়াকে নিয়ে দেশে থাকতেন মোশাররফ হোসেন।

জাকির হোসেন আরও বলেন, “মোশাররফ হোসেন চোখেও ভালোভাবে দেখতেন না। তাসমিয়ার একমাত্র অবলম্বন ছিলেন তাঁর বাবা।” তাসমিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন এবং তিনি অবিবাহিত। জাকির হোসেনের মতে, বাবাকে হারিয়ে এখন তাসমিয়া দিশাহারা, তাঁর কান্না থামানো যাচ্ছে না এবং স্বজনদের কোনো সান্ত্বনাই কাজে আসছে না।

বড় মেয়ে সারিকা আজমিরকে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর বাবার মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে এবং তিনি দেশে ফিরবেন। মোশাররফ হোসেনের মৃত্যুতে পরিবারের সবাই গভীরভাবে শোকাহত। জাকির হোসেন জানান, এই মৃত্যু নিয়ে তাঁদের মনে কোনো সন্দেহ নেই, তাই পুলিশের অনুমতি নিয়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্যানুসারে, শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে মেয়ে তাসমিয়াকে সাঁতার শেখাতে রাজধানীর অফিসার্স ক্লাবে যান মোশাররফ হোসেন। মেয়েকে সুইমিংপুলের কাছে রেখে তিনি ক্লাবের নির্মাণাধীন ভবনটির ভেতরে প্রবেশ করেন। এক ঘণ্টা পর বেলা সোয়া ১১টার দিকে ভবনটির নিচতলায় সিঁড়ির পাশ থেকে তাঁকে রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। উল্লেখ্য, মোশাররফ হোসেন অফিসার্স ক্লাবের সদস্য ছিলেন।

পুলিশি তদন্তের বিষয়ে ওসি ইয়াছিন মিয়া বলেন, “অফিসার্স ক্লাবের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, মোশাররফ হোসেন বারবার ওপরে উঠছিলেন, আবার নিচে নামছিলেন। হয়তো তিনি পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে বেজমেন্ট-১-এর লিফটের ফাঁকা জায়গা থেকে নিচে পড়ে যান তিনি।”

তিনি আরও জানান, মোশাররফ হোসেনের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটি দুর্ঘটনাজনিত বলে মনে হচ্ছে এবং তাঁর ভাই মোতাহার হোসেনের করা অপমৃত্যুর মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

তাসমিয়া মারজান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আগামীকাল সোমবার তাঁর বাবাকে মুন্সিগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হবে।”

একদিকে বাবাকে হারানোর তীব্র শোক, অন্যদিকে জীবনের এই কঠিন সময়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে দিশাহারা তাসমিয়া। যে বাবা ছিলেন তাঁর একমাত্র অবলম্বন, সেই বাবার মৃত্যুর শোক কোনো সান্ত্বনাতেই যেন কমছে না।