কলকাতার মানিকতলা এলাকার চোরবাগান সর্বজনীন পূজামণ্ডপে এক ভয়াবহ পদদলিত হওয়ার ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আহত আরও ২৫ জন বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, আহতদের মধ্যে তিনজনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।

ঘটনাটি ঘটে গতকাল শনিবার রাত নয়টার দিকে। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সেই সময় হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে দর্শনার্থীরা ভিড় ঠেলে হুড়োহুড়ি করে মণ্ডপের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির ফলেই পদদলিত হয়ে অনেকে প্রাণ হারান এবং আহত হন। বর্তমানে নিরাপত্তা বিবেচনায় মণ্ডপটি দর্শনার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

দুর্ঘটনার পর উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যে, ঘটনার সময় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী সহায়তা পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ট্রমা কেয়ার সেন্টারের অভাব নিয়েও তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।

পুলিশি সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনায় চরম গাফিলতির অভিযোগে গতকালই ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে।

এই শোকাবহ ঘটনায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন যে, পদদলিত হয়ে নিহত ব্যক্তিদের প্রত্যেকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দুই লাখ রুপি করে দেওয়া হবে। এছাড়া আহত ব্যক্তিদের প্রত্যেকের জন্য ৫০ হাজার রুপি করে আর্থিক সহায়তার কথা জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, খবর পাওয়ার পরপরই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিদর্শনে যান। সেখানে তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি ২৫ লাখ রুপি এবং আহতদের পরিবারের প্রতি ৫ লাখ রুপি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন।

আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের একজন সদস্যকে সরকারি চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। আহতদের চিকিৎসা প্রসঙ্গে তিনি জানান, আহত ব্যক্তিরা নিজেদের পছন্দমতো যেকোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারবেন এবং চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করবে রাজ্য সরকার। গাফিলতির বিষয়ে সতর্ক করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এ ঘটনায় কারও গাফিলতি পাওয়া গেলে ছাড় দেওয়া হবে না।” তিনি আরও জানান, টেলিভিশনের ফুটেজ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি কলকাতা হাইকোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের আবেদন জানাবেন। এই লক্ষ্যে তিনি খুব শীঘ্রই হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করবেন।

প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী উভয়েই এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন।

এই ঘটনার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কলকাতার তিনটি পূজামণ্ডপের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বন্ধ করা মণ্ডপগুলো হলো— টালা প্রত্যয়, আলিপুর সর্বজনীন ও চেতলা সম্মিলনী। এছাড়া মূল ঘটনাস্থল চোরবাগান সর্বজনীন পূজামণ্ডপটিও বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যের অন্যান্য পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।