ধূপের সুগন্ধ, ঢাকের গম্ভীর আওয়াজ আর পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে মুখরিত হয়ে উঠেছে রাজধানীর শ্রীশ্রী রমনা কালীমন্দির। দেবী দুর্গার সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন অসংখ্য ভক্ত। কেউ হাতে ফুল নিয়ে অঞ্জলি দিচ্ছেন, আবার কেউ গভীর প্রার্থনায় মগ্ন। পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি মন্দিরে চলছে আরতি। ঢাকের তালে তালে ভক্তদের আরতি ও নাচের মধ্য দিয়ে পুরো মন্দির প্রাঙ্গণে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
শনিবার সকালে শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমীতে রমনা কালীমন্দিরে এমন দৃশ্য দেখা যায়। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, দেবীর পূজা ও বিশেষ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে দিনটি উদ্যাপন করছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। পূজার পাশাপাশি পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে দেবীদর্শন এবং শহরের বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে দেখার ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো মহাসপ্তমী। মহাষষ্ঠীতে দেবীকে বরণের মাধ্যমে দুর্গাপূজার যে সূচনা হয়েছিল, তার মূল আনুষ্ঠানিকতা এদিন থেকে আরও বিস্তৃত হয়। নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন, সপ্তমাদি কল্পারম্ভ এবং সপ্তমীবিহিত পূজার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় দিনের প্রধান ধর্মীয় আচারগুলো। পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে চলে দেবী দুর্গার পূজা-অর্চনা। ফুল ও নানা উপচার নিবেদনের মাধ্যমে দেবীর কাছে প্রার্থনা জানান ভক্তরা।
সকাল সাড়ে আটটার দিকে মন্দির প্রাঙ্গণে দেখা যায়, পুরোহিত ও ভক্তরা পূজার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। খুব ভোরে ভক্তদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার পর একে একে ভিড় বাড়তে থাকে। বিশেষ করে অঞ্জলির সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মন্দির প্রাঙ্গণ।
ধর্মীয় রীতি মেনে নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপনের পর শুরু হয় সপ্তমাদি কল্পারম্ভ ও সপ্তমীবিহিত পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পুরোহিত শ্রী কানাই লাল চক্রবর্তীর মন্ত্রোচ্চারণে চলে দেবী দুর্গার পূজা-অর্চনা। তিনি ফুল ও নানা উপচার নিবেদন করে দেবীর আরাধনা করেন। এই সময়ে ভক্তরা দেবীর সামনে প্রার্থনায় অংশ নেন। মহাসপ্তমীর এসব আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেবীর কাছে মঙ্গল, শান্তি ও কল্যাণ কামনা করেন তাঁরা।
পূজার আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি মন্দিরে এসেছেন সব বয়সী মানুষ। কেউ স্ত্রী-সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে, কেউ বয়স্ক মা-বাবার হাত ধরে, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে এসেছেন দেবীদর্শনে। মণ্ডপে এসে পরিচিতজনদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন অনেকে। কেউ দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে প্রণাম করেন, কেউ হাত জোড় করে প্রার্থনায় মগ্ন থাকেন। ফুল হাতে অঞ্জলি দেওয়ার জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা যায় ভক্তদের।
ঢাকার ধামরাই থেকে আসা তনয় ভৌমিক দেবী দুর্গাকে অঞ্জলি দেওয়া শেষে কথা বলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মা তৃপ্তি রানী তরফদার। তনয় মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ধামরাই থেকে রমনা কালীমন্দিরে এসেছি আমরা। এখানে পূজা দেওয়া ও প্রতিমা দর্শনের মধ্য দিয়ে মহাসপ্তমীর দিনটি শুরু করেছি। মন্দিরের পরিবেশে দেবীর কাছে প্রার্থনা করতে এবং অঞ্জলি দিতে পেরে আমার ভালো লাগছে।”
মহাসপ্তমীতে দেবী দুর্গার আরাধনার মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভশক্তির প্রতিষ্ঠার প্রার্থনা করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। দুর্গোৎসবের এই দিনে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি পরিবার-পরিজন, বন্ধু ও পরিচিতজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার উপলক্ষও তৈরি হয়। একসঙ্গে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে প্রতিমা দেখা এবং উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন অনেকে।
পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার থেকে সহপাঠী ও বন্ধুদের সঙ্গে রমনা কালীমন্দিরে এসেছেন বিজয় ঘোষ, রিমা সরকার, সংগীতা দাস ও বিপ্লব কুমার। তাঁদের মধ্যে রিমা ও সংগীতা মণ্ডপের সামনে বসে অঞ্জলি দিচ্ছিলেন। আর বিজয় ও বিপ্লব দাঁড়িয়ে ছিলেন প্যান্ডেলের ভেতরে কিছুটা দূরে। পূজার আনুষ্ঠানিকতা ও মন্দিরের পরিবেশ উপভোগ করছিলেন তাঁরা।
বিপ্লব কুমার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পূজার আয়োজন ও সার্বিক পরিবেশ আমাদের ভালো লেগেছে। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং এক মণ্ডপ থেকে আরেক মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দেখার আনন্দই আলাদা। রমনা কালীমন্দিরে দেবীদর্শন ও অঞ্জলি পর্ব শেষে আমরা ঢাকার আরও কয়েকটি পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখব।”
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির ও খামারবাড়ির পূজামণ্ডপে তাঁদের অন্য বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে বিপ্লব বলেন, “পূজার ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরা, প্রতিমা দেখা ও আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়াই আমাদের কাছে দুর্গোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।”
শ্রীশ্রী রমনা কালীমন্দিরে মহাসপ্তমীর পূজার আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন পুরোহিত শ্রী কানাই লাল চক্রবর্তী। পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মহাসপ্তমীর পূজা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এদিন দেবী দুর্গার কাছে ভক্তদের মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা করে প্রার্থনা করেছেন তাঁরা। মা যেন সব বিপদ-আপদ থেকে ভক্তদের রক্ষা করেন এবং সবার জীবনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসেন—এটাই তাঁদের প্রার্থনা।”
শ্রী কানাই লাল চক্রবর্তী আরও বলেন, “শুধু ভক্তদের নয়, বিশ্বের সব মানুষের শান্তি ও মঙ্গল কামনাও করেছেন তাঁরা। পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় থাকুক, হিংসা-বিদ্বেষ দূর হোক এবং বিশ্ববাসী যেন শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে, দেবীর কাছে সেই প্রার্থনাও জানিয়েছেন তাঁরা।”