শৈশবেই এক ভয়াবহ বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় শরীরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হারিয়েছেন সাহাকুল ইসলাম। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাকে দমাতে পারেনি। অন্যের করুণায় বেঁচে থাকার চেয়ে নিজের শ্রমে স্বাবলম্বী হওয়ার সংকল্প নিয়ে মেহেরপুর সদর উপজেলার গোপালপুর গ্রামের এই যুবক গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ছাগলের খামার।

সাহাকুলের জীবনসংগ্রাম শুরু হয় চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। চিকিৎসার বিপুল ব্যয় মেটাতে গিয়ে তার পরিবার প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল। এমন কঠিন সময়ে অনেকেই তাকে ভিক্ষাবৃত্তির পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু আত্মমর্যাদা ধরে রেখে নিজের পরিশ্রমে বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরিবারের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে কেনা পাঁচটি ছাগল ছিল তার লড়াইয়ের শুরু। অত্যন্ত যত্ন ও পরিচর্যার মাধ্যমে তিনি সেই খামারটিকে এগিয়ে নেন। বর্তমানে তার খামারে ২০টি ছাগল রয়েছে। ছাগলের বাচ্চা বিক্রি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে বড় ছাগল বিক্রি করে তিনি আয় করেন। এই আয়ের মাধ্যমেই স্ত্রী ও দুই সন্তানের ভরণপোষণ চলে তার সংসারে। যদিও সীমিত আয়ের কারণে মাঝেমধ্যে পরিবারের সব চাহিদা মেটাতে তাকে হিমশিম খেতে হয়।

সাহাকুলের এই জীবনকাহিনি কেবল শারীরিক সীমাবদ্ধতা জয়ের গল্প নয়, বরং এটি দুর্ঘটনার পর ঘুরে দাঁড়ানো এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে টিকে থাকার এক অনন্য উদাহরণ। তার এই লড়াই সামনে নিয়ে আসে দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি হওয়া মানুষের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো।

ঘটনাটি স্মরণ করে সাহাকুলের ভাষ্য অনুযায়ী, ১১ বছর বয়সে মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সংস্পর্শে এসে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন তিনি। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন তার দুই হাতে পচন ধরে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে পড়ে যে, শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হাত দুটি বিচ্ছিন্ন করতে হয়।

সন্তানের এই কঠিন চিকিৎসায় বিপুল অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েন সাহাকুলের বাবা জামাত আলী ও মা বুলুজান খাতুন। একদিকে চিকিৎসার খরচ আর অন্যদিকে সংসার চালানোর চাপ—সব মিলিয়ে ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন তারা।

এমন অসহায় পরিস্থিতিতে অনেকে সাহাকুলকে ভিক্ষা করার পরামর্শ দিলেও তিনি তাতে রাজি হননি। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী উপার্জনের পথ খুঁজতে থাকেন তিনি। একপর্যায়ে বাবার কাছে কয়েকটি ছাগল কিনে দেওয়ার আবদার জানান। আর সেখান থেকেই শুরু হয় তার স্বাবলম্বী হওয়ার দীর্ঘ লড়াই।

গ্রামের মাঠে ছাগল চরানো এবং নিয়মিত পরিচর্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার কর্মজীবন। সময়ের সাথে সাথে ছাগলের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং তার ছোট উদ্যোগটি ধীরে ধীরে একটি খামারে পরিণত হয়। তবে এই আয় দিয়ে সংসারের সব ব্যয় মেটানো সহজ নয়। পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামলাতে তাকে প্রায়ই আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।

সাহাকুলের স্ত্রী তারিফা খাতুন জানান, স্বামীর শারীরিক সীমাবদ্ধতার কথা জেনেই তিনি এই সংসার শুরু করেছেন। তিনি বলেন, “স্বামী নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিশ্রম করে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন এটাই তার কাছে গর্বের বিষয়।” সংসারের সব চাহিদা পুরোপুরি পূরণ না হলেও সাহাকুলের এই প্রচেষ্টাকেই তিনি সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখেন।

সাহাকুলের বাবা জামাত আলী বলেন, “ছেলের দুই হাত হারানোর পর তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল তার ভবিষ্যৎ নিয়ে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, এই সময়ে কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাহাকুলের সরলতার সুযোগ নিয়ে তার সাথে প্রতারণা করেছে। তবে ছেলে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে না নিয়ে নিজের উদ্যোগে জীবিকা গড়ে তুলেছে, এটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

গ্রামের বাসিন্দা দুলাল মিয়া বলেন, “দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও সাহাকুল নিজের কর্মসংস্থান গড়ে তুলে দেখিয়েছেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও কাজ করে পরিবারে অবদান রাখতে পারেন।”