ভারতে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা এবং বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ প্রখ্যাত সাহিত্যিক সালমান রুশদি। একই সঙ্গে তিনি ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে অন্যদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের একটি রেস্তোরাঁয় আয়োজিত নৈশভোজে ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার সময় এই উদ্বেগের কথা জানান রুশদি। এশিয়ান আমেরিকান রাইটার্স ওয়ার্কশপের তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে তিনি গেরুয়া শিবিরের কট্টরপন্থার তীব্র সমালোচনা করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ভারতের অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা দীর্ঘদিন পর আমাদের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছে।’
ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে রুশদি বলেন, ‘ভারতে একটা ঘটনা ঘটছে বটে। পরিস্থিতি ফুটন্ত অবস্থায় রয়েছে। আমি এমন একটা কথা বলব, যা হয়তো রেস্তোরাঁয় বলা উচিত নয়—ককরোচদের আন্দোলনকে “উদ্যাপন” করুন। ভারতের অল্প বয়স্ক ছেলেমেয়েরা দীর্ঘদিন পর আমাদের মধ্যে একটা আশার আলো জাগিয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের পাশে দাঁড়ান।’
সাংবাদিক ও লেখক অমিতাভ কুমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সালমান রুশদির এই বক্তব্যের একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। রুশদির এই মন্তব্যের পর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং ডানপন্থী চিন্তকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য, এক সময় ‘ইসলামি কট্টরপন্থা’র বিরুদ্ধে লেখনীর কারণে হিন্দুত্ববাদী মহল রুশদিকে ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতীক’ হিসেবে অভিহিত করে প্রশংসা করত। তবে মোদি সরকারের সমালোচনায় সোচ্চার হওয়ায় এখন তারা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ।
শৈশবের স্মৃতিচারণ করে রুশদি বলেন, এক সময় ভারতে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে সব সম্প্রদায়ের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতেন, যা সম্প্রীতির এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করেছিল। তিনি বলেন, তিনি যখন ‘বোম্বেতে’ বড় হচ্ছিলেন, তখন কেউ হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিষ্টান না পার্সি—তা দেখা হতো না। সবাই একসঙ্গে সবকিছু উদ্যাপন করত। কিন্তু বর্তমান ভারতে সেই পরিবেশ আর দেখা যায় না।
সম্প্রতি টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদনেও এই সাম্প্রদায়িক দূরত্বের বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপূজায় আগে সব সম্প্রদায়ের মানুষ অংশ নিলেও এবার মুসলিম সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কট্টরপন্থীদের একাংশ মুসলমানদের পূজামণ্ডপে না আসার আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন ভিডিও প্রকাশ করায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির মা এবং প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক মীরা নায়ারও ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। মূল অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সেখানে তাঁর জন্মদিনও পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে নিজেকে ‘ককরোচদের মা’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে মীরা নায়ার বলেন, ভারতে ‘আরশোলারা’ গণতন্ত্রের জন্য লড়ছে এবং এ জন্য মা হিসেবে তিনি গর্বিত।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক মানুষ রুশদির এই অবস্থানের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, নিউইয়র্কের ওই নৈশভোজে তরুণদের আন্দোলনকে সমর্থন করার মাধ্যমে রুশদি ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি জায়গায় আঘাত করেছেন, আর সেই কারণেই তাঁকে এখন সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে।