ফুটবল বিশ্বে কিছু সিদ্ধান্তের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায়, আবার কিছু ক্ষেত্রে উত্তরের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মনে হয় ক্লাবটি এক বিশাল ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া খেলছে। এই জুয়া সফল হলে তাকে দূরদর্শিতা বলা হয়, আর ব্যর্থ হলে তা হয়ে দাঁড়ায় চরম নির্বুদ্ধিতা।

গত গ্রীষ্মকালীন দলবদলের বাজারে বার্সেলোনা যখন মার্কাস রাশফোর্ডকে স্থায়ীভাবে দলে না রেখে অ্যান্টনি গর্ডনের পেছনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিল, তখন ফুটবল মহলে সেটিকে একটি বড় জুয়া হিসেবেই দেখা হয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, যে খেলোয়াড় ইতিমধ্যে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন, তাঁকে ছেড়ে কেন এমন একজনের পেছনে ছুটছে বার্সেলোনা, যাঁকে নতুন করে সবকিছু প্রমাণ করতে হবে?

চলতি মৌসুমের মাত্র ১০টি ম্যাচ শেষ হয়েছে। এখনই চূড়ান্ত কোনো রায় দেওয়ার সময় আসেনি। তবে গর্ডন এরই মধ্যে মাঠের এমন কিছু পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন, যার ফলে বার্সেলোনার এই সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তিগুলো এখন পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।

গত মৌসুমে লিগসহ বার্সেলোনার দুটি শিরোপা জয়ের লড়াইয়ে ইংলিশ ফরোয়ার্ড রাশফোর্ডের অবদান ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ধারে খেলতে এসে ৪৯টি ম্যাচে তিনি ১৪টি গোল করেন এবং সতীর্থদের দিয়ে করান আরও ১৫টি। সব ম্যাচে শুরুর একাদশে জায়গা না পেলেও, সুযোগ পেলেই তিনি নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছিলেন।

গতি, গোল করার সহজাত দক্ষতা এবং ফাঁকা জায়গা কাজে লাগানোর অসাধারণ ক্ষমতা দিয়ে বার্সেলোনার আক্রমণভাগে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন রাশফোর্ড। সবচেয়ে বড় কথা, কোচ হান্সি ফ্লিকের খেলার ধরনটিও তাঁর বেশ চেনা হয়ে গিয়েছিল। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল, মাত্র ৩ কোটি ইউরোয় তাঁকে স্থায়ীভাবে দলে নেওয়ার সুযোগ ছিল বার্সেলোনার সামনে। বর্তমান ফুটবল বাজারের হিসেবে এমন একজন খেলোয়াড়ের জন্য এই অঙ্কটি মোটেও বেশি নয়।

এত কিছুর পরেও বার্সেলোনা ভিন্ন পথ বেছে নিল। তারা ৮ কোটি ইউরো খরচ করে গর্ডনকে দলে নিল। কেন এই সিদ্ধান্ত? এর উত্তর লুকিয়ে আছে কোচ হান্সি ফ্লিকের ফুটবল দর্শনের গভীরে।

জার্মান এই কোচের ফুটবলে শুধু বল পায়ে ভালো খেললেই চলে না; বল পায়ে না থাকলেও সমান তীব্রতায় খেলতে হয়। প্রতিপক্ষের পায়ে বল থাকলে তাকে তাড়া করতে হয়, জায়গা বন্ধ করতে হয় এবং আক্রমণ শুরুর আগেই তা থামানোর চেষ্টা করতে হয়।

রাশফোর্ডের সীমাবদ্ধতা ছিল ঠিক এই জায়গাতেই। বিশেষ করে যখন প্রতিপক্ষ নিচে নেমে জমাট রক্ষণ গড়ে তুলত, তখন তাঁর কার্যকারিতা কমে যেত। বল ছাড়া তাঁর মুভমেন্ট কিংবা প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার তীব্রতা সব সময় ফ্লিকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারত না। গত মৌসুমে রাফিনিয়া যখন চোটের কারণে বাইরে ছিলেন, তখন রাশফোর্ড তাঁর জায়গায় খেলেছিলেন। কিন্তু বল ছাড়া রাফিনিয়া যে পরিমাণ পরিশ্রম করতেন, রাশফোর্ডের খেলায় সেটির ঘাটতি স্পষ্টভাবে চোখে পড়েছিল। আর ঠিক এই জায়গাতেই গর্ডন নিজেকে আলাদা প্রমাণ করেছেন।

নিউক্যাসলের সাবেক উইঙ্গার গর্ডনকে শুধু গতির জন্য দলে নেওয়া হয়নি। তাঁকে নেওয়া হয়েছে এমন এক ফুটবলার হিসেবে, যিনি ফ্লিকের ফুটবল দর্শনের সঙ্গে নিজেকে পুরোপুরি মিলিয়ে নিতে পারবেন। মৌসুমের প্রথম ১০টি ম্যাচের ৭টিতেই শুরুর একাদশে ছিলেন ২৫ বছর বয়সী এই ইংলিশ উইঙ্গার। সব মিলিয়ে খেলেছেন ৯টি ম্যাচ। গোল করেছেন ২টি এবং করিয়েছেন ৫টি। পরিসংখ্যানগুলো বেশ ভালো। তবে তাঁর আসল অবদান বুঝতে হলে শুধু গোল আর অ্যাসিস্টের হিসাবে চোখ রাখলে চলবে না; দেখতে হবে বল যখন তাঁর পায়ে থাকে না, তখন তিনি কী করেন।

গর্ডন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের প্রচণ্ড তাড়া করেন। বিপক্ষের ফুলব্যাককে অনুসরণ করে নিজেদের রক্ষণভাগকেও সাহায্য করেন তিনি। সুযোগ পেলেই রক্ষণভাগের পেছনের ফাঁকা জায়গায় দ্রুত দৌড় দেন। কখনো তাঁর সেই দৌড়েই আক্রমণের সুযোগ তৈরি হয়, আবার কখনো সতীর্থদের জন্য জায়গা খুলে যায়। ফ্লিকের ফুটবলে এই ছোট ছোট কাজের মূল্য অনেক। কারণ, বার্সেলোনার আক্রমণাত্মক ফুটবলের অন্যতম ভিত্তি হলো প্রতিপক্ষকে ক্রমাগত চাপে রাখা এবং বল হারানোর পর যত দ্রুত সম্ভব সেটি পুনরুদ্ধার করা। গর্ডন এই কাজটি অত্যন্ত স্বাভাবিক দক্ষতায় সম্পন্ন করেন।

নিউক্যাসলে থাকাকালীন বল ছাড়া তাঁর পরিশ্রমের সুনাম ছিল। স্পেনে এসে সেটিকে তিনি আরও এক ধাপ ওপরে নিয়ে গেছেন। তবে গর্ডনের আরেকটি বড় অবদান হলো বার্সেলোনার আক্রমণে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।

ডান প্রান্তে লামিনে ইয়ামাল থাকলে কী হয়, তা এখন আর কাউকে বুঝিয়ে বলতে হয় না। তরুণ এই উইঙ্গার বল পায়ে পেতে ভালোবাসেন, প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে ভেতরে ঢোকেন এবং সুযোগ তৈরি করেন। আক্রমণের অনেক কিছুই তাঁকে ঘিরে আবর্তিত হয়। কিন্তু দুই প্রান্তের দুই উইঙ্গারই যদি সব সময় বল পায়ে চান, তবে আক্রমণে সমস্যা তৈরি হয়। গর্ডন সেই সমস্যার সমাধান দিচ্ছেন।

ইয়ামাল যখন ডান দিকে বল নিয়ে প্রতিপক্ষের মনোযোগ নিজের দিকে টেনে নেন, গর্ডন তখন বাঁ প্রান্তে ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেন। কখনো রক্ষণভাগের পেছনে ছুটে যান, আবার কখনো এমন জায়গায় অবস্থান নেন, যেখান থেকে পেদ্রি কিংবা অন্য কোনো সৃজনশীল মিডফিল্ডার সহজেই তাঁকে বল বাড়াতে পারেন। অর্থাৎ ইয়ামাল যেখানে বল পায়ে জাদু দেখাতে চান, গর্ডন সেখানে বল ছাড়াই নিজের কাজটা করে যান। দুজনের খেলার ধরন আলাদা, কিন্তু সেই পার্থক্যটাই বার্সেলোনার আক্রমণকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলছে।

রাশফোর্ডকে স্থায়ীভাবে না রাখার মানে এই নয় যে বার্সেলোনা তাঁর সামর্থ্য নিয়ে সন্দিহান ছিল। বরং কাতালানরা এমন একজনকে চেয়েছে, যিনি বর্তমানের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের পরিকল্পনাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন। সে কারণেই রাশফোর্ড নন, বেছে নেওয়া হয়েছে ২৫ বছর বয়সী গর্ডনকে। তবে ফুটবলে অন্য একটা পথও আছে। আজ যে সিদ্ধান্তকে দূরদর্শিতা মনে হচ্ছে, কাল সেটিই ভুল প্রমাণিত হতে পারে। আবার আজকের প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তই একদিন হয়ে উঠতে পারে সাফল্যের সবচেয়ে বড় কারণ। গর্ডন এখন সেই দুই সম্ভাবনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে।

বার্সেলোনা আপাতত উত্তর পেতে শুরু করেছে। তবে পুরো উত্তরটা লিখতে হবে গর্ডনকেই।