নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ময়মনসিংহে এক মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের সামনে সাধারণ সাংবাদিকদের উদ্যোগে এই কর্মসূচি পালিত হয়।
মানববন্ধনে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। তারা আলিফ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
মানববন্ধনে উপস্থিত বক্তারা বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হত্যার শিকার হওয়া অত্যন্ত নিন্দনীয় ও উদ্বেগজনক। এ ধরনের ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। আলিফ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে হবে।
বক্তারা আরও উল্লেখ করেন যে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় কোনো সাংবাদিক যাতে হামলা, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার না হন, সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সাংবাদিকদের ওপর সংঘটিত অপরাধের বিচার নিশ্চিত না করা গেলে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মানববন্ধনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা জোরদার, আলিফ হত্যার সুষ্ঠু বিচার এবং স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক ইউনিয়ন ময়মনসিংহের সভাপতি এম আইয়ুব আলী, ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম, টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অমিত রায়, টেলিভিশন রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি বাবুল হোসেন, নিউজ চ্যানেল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুনুর রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক এ এস এম হোসাইন শাহীদ, ময়মনসিংহ রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম উজ্জ্বল, সাংবাদিক নিয়ামুল কবীর সজলসহ অন্যান্য সাংবাদিকেরা।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত আটটার দিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের তেলনজিয়া বাজারে একটি দোকানে চা খেয়ে বের হচ্ছিলেন লুৎফুজ্জামান। ঠিক সেই মুহূর্তে দুজন যুবক এসে তার ওপর পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়ে। গুলির শব্দে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে হামলাকারীরা কিছুটা দূরে রাখা মোটরসাইকেলে উঠে পালিয়ে যায়। পরে লুৎফুজ্জামানকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘রূপসী বাংলা’র নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন, যেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখি করা হতো। তার গ্রামের বাড়ি কলমাকান্দার পোগলা এলাকায়। তবে তিনি দুর্গাপুরের বিরিশিরি এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন।
লুৎফুজ্জামান প্রায় ছয় বছর আগে তেলনজিয়া গ্রামের আনন্দিতা সংমাকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির চার বছর বয়সী একটি মেয়ে ও দেড় বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ খান জানান, “নিহত সাংবাদিকের মাথা, গলা ও বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে তদন্ত করা হচ্ছে।”
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশি অভিযান চালানো হচ্ছে।”
উল্লেখ্য যে, এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা লুৎফুজ্জামানকে কুপিয়ে জখম করেছিল। সে সময় তার সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়।