নিজেদের ঘরের মাঠে মিসরের বিপক্ষে এক ম্যাচে মুসলিমবিদ্বেষী স্লোগান দেওয়ার দায়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তির সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে ফিফা। স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের করা আপিল খারিজ করে দিয়ে সংস্থাটি এই কঠোর পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। শাস্তিস্বরূপ স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনকে ২০ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি, তাদের পরবর্তী ঘরের মাঠের প্রীতি ম্যাচে স্টেডিয়ামের অন্তত ১৫ শতাংশ আসন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ফিফা স্পেনের বিরুদ্ধে এই শাস্তি বহাল থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৪ আগস্ট ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি প্রথমবার এই শাস্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং পরদিন তা স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনকে অবহিত করা হয়। তবে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্প্যানিশ ফেডারেশন আপিল করলেও সম্প্রতি ফিফার আপিল কমিটি তা খারিজ করে দেয়।
পুরো ঘটনাটি ঘটেছিল গত ৩১ মার্চ। বার্সেলোনার আরসিডিই স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল স্পেন ও মিসর। ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হলেও মাঠের বাইরে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। ম্যাচের দশম মিনিটে গ্যালারির একটি অংশ থেকে মুসলিমবিদ্বেষী স্লোগান দেওয়া হয়। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে, যখন ৪৭তম মিনিটে পুনরায় একই ধরনের স্লোগান দেওয়া হতে থাকে।
তদন্তে জানা গেছে, সমর্থকদের একটি অংশ স্লোগান দিচ্ছিল, ‘যারা লাফাচ্ছে না, তারা মুসলিম।’ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে কর্তৃপক্ষ। স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় বৈষম্যবিরোধী বার্তা প্রদর্শন করা হয় এবং মাইকের মাধ্যমে সমর্থকদের সতর্ক করা হয়। তবে এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন স্পেনের তারকা ফুটবলার লামিনে ইয়ামাল। নিজে মুসলিম হওয়ায় এই ঘটনা তাকে গভীরভাবে আহত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্সেলোনার এই ফরোয়ার্ড লিখেছিলেন, ‘মাঠে কাউকে বিদ্রূপ করতে ধর্মকে ব্যবহার করলে নিজেদের অজ্ঞ ও বর্ণবাদী হিসেবেই পরিচয় দেওয়া হয়।’ যদিও ইয়ামাল সরাসরি ওই স্লোগানের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন না, তবুও একজন মুসলিম হিসেবে তিনি বিষয়টিকে চরম অসম্মানজনক ও অসহনীয় আচরণ বলে অভিহিত করেন।
ঘটনার পরপরই স্পেনজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় এবং স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনও সমর্থকদের এই আচরণের তীব্র নিন্দা জানায়। দেশটির পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করে। পরবর্তীতে ৭ এপ্রিল স্প্যানিশ ফেডারেশনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রম শুরু করে ফিফা।
তদন্ত ও শুনানির সময় স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন নিজেদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে। তাদের দাবি ছিল, ‘মুসলিম’ শব্দটি নিজে কোনো অবমাননাকর শব্দ নয়। তাই এই ঘটনাটিকে বৈষম্যমূলক আচরণের পরিবর্তে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বার্তাসংক্রান্ত বিধির আওতায় বিবেচনা করা উচিত।
তবে ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি এই যুক্তি গ্রহণ করেনি। কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কোনো শব্দ এককভাবে আপত্তিকর না হলেও, সেটি ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং পরিস্থিতির কারণে বৈষম্যমূলক হয়ে উঠতে পারে। মিসরের বিপক্ষে ম্যাচে দেওয়া স্লোগানগুলো সেই ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে।
ফিফা স্বীকার করেছে যে, ঘটনার পর স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছিল। সমর্থকদের সতর্ক করা, ঘটনার নিন্দা জানানো এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও সমর্থকদের আচরণের গুরুত্ব বিবেচনা করে শাস্তি প্রদান প্রয়োজন বলে মনে করেছে সংস্থাটি।
আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি স্পেনের পরবর্তী ঘরের মাঠের প্রীতি ম্যাচে স্টেডিয়ামের অন্তত ১৫ শতাংশ আসন বন্ধ রাখতে হবে। মূলত দুই গোলপোস্টের পেছনের গ্যালারিতে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ফিফার বিশেষ অনুমোদন সাপেক্ষে ওই বন্ধ রাখা আসনগুলোতে পরিবার, শিক্ষার্থী কিংবা বৈষম্যবিরোধী সংগঠনের প্রতিনিধিদের বসানোর সুযোগ থাকবে। সেক্ষেত্রে ম্যাচের অন্তত ১৫ দিন আগে বৈষম্যবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রমসহ একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা জমা দিতে হবে স্প্যানিশ ফেডারেশনকে।
জরিমানার অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ফিফা বিশেষ শর্ত আরোপ করেছে। নির্ধারিত ছয় মাসের মধ্যে ২০ হাজার ডলার বৈষম্যবিরোধী কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করতে পারবে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন। এর জন্য ফিফার অনুমোদিত একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি এই শর্ত পূরণ করা না যায়, তবে জরিমানার পুরো অর্থ সরাসরি ফিফাকে প্রদান করতে হবে।
এর ফলে স্পেনের শাস্তি কেবল আর্থিক জরিমানা বা আসন বন্ধ রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং ভবিষ্যতে স্টেডিয়ামে বৈষম্যমূলক আচরণ রোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণের বাধ্যবাধকতাও তৈরি হয়েছে। আপিল খারিজ হওয়ায় এখন এই সব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনকে।