বন্ড সুবিধায় ১০–৩০ কাউন্টের কটন বা তুলার তৈরি সুতা আমদানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকেরা। তাঁদের দাবি, সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের এই সিদ্ধান্ত রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের জন্য এক চরম সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই পদক্ষেপের ফলে কাঁচামাল আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিদেশি ক্রেতারা ইতিমধ্যে বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে ভারত ও মিসরের মতো দেশে পোশাকের ক্রয়াদেশ স্থানান্তর করতে শুরু করেছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরিত এক চিঠিতে বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানির এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ। সংগঠন দুটির সভাপতি, অর্থাৎ বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম যৌথভাবে এই আবেদনপত্রটি পেশ করেন।

চিঠিতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সভাপতি উল্লেখ করেন যে, গত বছর স্থলপথে সুতা আমদানি বন্ধ করা, সুতা আমদানির ওপর সেফগার্ড ডিউটি আরোপের জন্য দুইবার তৎপরতা চালানো এবং ২০২৬–২৯ সালের আমদানি নীতিতে নিট কাপড় আমদানি নিষিদ্ধ করে পরবর্তীতে তা প্রত্যাহারের মতো ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে। তাঁরা বলেন, ‘নীতি অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের ধারাবাহিকতা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ বৃদ্ধি করে বলে প্রতিয়মান হয়। ক্রেতারা ইতিমধ্যে ভারত ও মিসরে তাদের ক্রয়াদেশ স্থানান্তর করছে বলে আমরা অবগত হয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রীকে লেখা ওই চিঠিতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সভাপতি অভিযোগ করেন, গত ২০ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বস্ত্র ও পোশাক খাতসংক্রান্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় নির্ধারিত আলোচ্যসূচির বাইরে গিয়ে বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর প্রতিনিধিরা ১০–৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানির বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের বিষয়টি উত্থাপন করেন। যদিও সভায় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, তবে সভার কার্যবিবরণীতে কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার এবং ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে আমদানির অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি সিদ্ধান্ত হিসেবে যুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ওই কার্যবিবরণীর ওপর ভিত্তি করে ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার এবং ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির আদেশ জারি করে।

চিঠিতে আরও জানানো হয়, তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের অনুরোধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১৩ সেপ্টেম্বর সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত স্থগিত করার জন্য এনবিআরকে চিঠি পাঠিয়েছিল। তবে এনবিআর সেই আদেশ প্রত্যাহার করেনি। উল্টো গত বুধবার সংস্থাটি অনুরূপ আরেকটি আদেশ জারি করেছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর দাবি, এর ফলে রপ্তানি কার্যক্রমে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর অভিযোগ, এনবিআরের এই আদেশের পর স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো সুতার দাম প্রতি পাউন্ডে ৩০–৫০ সেন্ট বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, আমদানি করা সুতার ক্ষেত্রে শুল্ক ও কর পরিশোধ অথবা ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়ার কারণে রপ্তানিকারকদের চলতি মূলধন আটকে যাচ্ছে। এতে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিট পোশাক খাত তার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তীব্র তারল্যসংকট সৃষ্টি হয়েছে, যা সরবরাহ শৃঙ্খল বজায় রাখা এবং উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমতাবস্থায়, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সভাপতি এনবিআরের জারি করা আদেশটি অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহারের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁরা মত প্রকাশ করেন যে, এলডিসি থেকে উত্তরণ পর্যন্ত এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে আদেশটি প্রত্যাহারের পর বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি টেকসই নীতিকাঠামো প্রণয়ন করা যেতে পারে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।