সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে যে হিজাব নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের জেরে আজারবাইজানের সেনাবাহিনী দেশটির প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের ছবি সরিয়ে ফেলছে। তবে বিস্তারিত যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এই ভিডিওর মূল দৃশ্যটি সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ছবি সরিয়ে ফেলার একটি পুরনো ভিডিও থেকে নেওয়া হয়েছে।
ছয় সেকেন্ডের ওই ভিডিওটিতে দেখা যায়, রাস্তার মাঝখানের আইল্যান্ডে বসানো একটি বিলবোর্ডে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের ছবি রয়েছে। মুখোশ পরিহিত এবং কাঁধে অস্ত্র ঝোলানো দুই ব্যক্তিকে বিলবোর্ডটি উপড়ে ফেলতে দেখা যায়। তাঁদের পোশাক দেখে মনে হয় তাঁরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য।
‘ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এ হক পেইজ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে এই বিভ্রান্তিকর ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি ২২ লাখ বার দেখা হয়েছে এবং এতে ২৩ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া এসেছে। উল্লেখ্য, মো. আবদুল হক বা এম এ হক গত সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–২ আসন থেকে জামায়াতের মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিএনপির আমানউল্লাহ আমানের কাছে পরাজিত হন। তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং টিভি বিতর্কগুলো নিয়মিত ওই ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হয়।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে আজ শুক্রবার বিকেল ৫টা ১২ মিনিটে এম এ হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পেজটি আমিই পরিচালনা করি। হিজাব বিতর্কে আজারবাইজানের সেনাবাহিনী দেশটির প্রেসিডেন্টের ছবি সরিয়ে ফেলছে—এমন একটি ভিডিও এক্সে পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, ভিডিওটি ফেসবুকে শেয়ার করা দরকার, তাই পোস্ট দিয়েছি। এআই সম্পর্কে আমার তেমন ধারণা নেই। আমি শিগগির বিষয়টি সংশোধন করব।” তবে সন্ধ্যা সোয়া ছয়টা পর্যন্ত ওই পেজ থেকে পোস্টটি সরানো বা সংশোধন করা হয়নি।
ভিডিওটির ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছিল, “স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ করার মতো এক বোকামিপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণে আজারবাইজানি সেনাবাহিনী রাস্তাঘাট থেকে প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের ছবি সরিয়ে ফেলতে শুরু করেছে! যে দেশের ৯৬ শতাংশ মানুষই মুসলিম, সেখানে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো—এর উদ্দেশ্য কী?” প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ফেসবুকে ৩০টির বেশি পেজ ও প্রোফাইলে এই দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া এক্স (সাবেক টুইটার) এবং ইনস্টাগ্রাম প্ল্যাটফর্মেও ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে।
ভিডিওটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে বেশ কিছু অসংগতি ধরা পড়ে। ভিডিওর শুরুতে দুজন ব্যক্তিকে বিলবোর্ড উপড়ে ফেলতে দেখা গেলেও পরের অংশে একজনের অবয়ব অস্পষ্ট হয়ে যায়। এমনকি ডান পাশে থাকা একজন ব্যক্তি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যান, যদিও তাঁর পোশাকটি মাটিতে পড়ে থাকে। এআই শনাক্তকরণে ব্যবহৃত বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ভিডিওটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া আজারবাইজানের স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্টের ছবি সরানোর কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
রিভার্স সার্চের মাধ্যমে ভিডিওটির মূল উৎস খুঁজে পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক ভিডিওতে সিরিয়ার আলেপ্পো শহরে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ছবি সরিয়ে ফেলার দৃশ্য দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়, ২০২৪ সালের নভেম্বরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর শহরটিতে প্রবেশের পর এসব দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল। অনলাইনে পাওয়া সেই মূল ভিডিওগুলোতে বিলবোর্ডে বাশার আল-আসাদের ছবি ছিল, যা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে বদলে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের ছবি বসানো হয়েছে।
এদিকে আজারবাইজানে সরকারি স্কুলের পোশাকবিধি নিয়ে বর্তমানে তীব্র বিতর্ক চলছে। ২০২৬ সালের ৭ জুলাই দেশটির সাধারণ শিক্ষা আইনে সংশোধনী আনা হয়। পরবর্তীতে ২১ সেপ্টেম্বর স্কুলের পোশাক এবং ৬ অক্টোবর শিক্ষকদের পোশাক সংক্রান্ত পৃথক বিধিমালা অনুমোদন করা হয়। নতুন নিয়মে হিজাবের কথা সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, এর প্রয়োগের ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বাধার মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিবিসি, আল-জাজিরা ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক স্কুলে হিজাব পরা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ঢুকতে দেওয়া হয়নি এবং কিছু শিক্ষককে মাথার স্কার্ফ খুলতে বলা হয়েছে। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জন ও অভিভাবকদের বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
গত ১২ অক্টোবর আজারবাইজানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পোশাকবিধি কার্যকর করা নিয়ে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার অভিযোগে ৩৭ জনকে আটক করা হয়েছে। আজারবাইজান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও রাষ্ট্রটি ধর্মনিরপেক্ষ। দেশটির সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও শিক্ষার অধিকার স্বীকৃত। সরকার যেখানে অভিন্ন পোশাকবিধি ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার কথা বলছে, সেখানে বিশ্লেষকদের মতে নতুন নিয়মের প্রয়োগ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও শিক্ষার অধিকারকে খর্ব করতে পারে। এই নিয়ে দেশটিতে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।