মাঠের লড়াইয়ে ভারতের সাথে সমানে সমানে লড়াই করে যাচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম চার ম্যাচ শেষে দুই দলের জয়ের পাল্লা সমান, উভয়েই জিতেছে দুটি করে ম্যাচ। তবে মাঠের বাইরের আয়ের হিসাবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং দুই বোর্ডের মধ্যে ব্যবধান আকাশ-পাতাল। ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রধান নির্বাহী ক্রিস ডেরিংয়ের হিসাব অনুযায়ী, ভারতে একটি সিরিজ আয়োজন থেকে দুই থেকে তিন কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে। কিন্তু অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয় যে, এই বিশাল অঙ্কের সম্প্রচার আয়ের কোনো অংশই পাচ্ছে না ক্যারিবীয় বোর্ড। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বর্তমান আয় বণ্টনব্যবস্থার এই চরম বৈষম্যের কড়া সমালোচনা করেছেন ডেরিং।

ক্রিকেটবিষয়ক সাময়িকী উইজডেনের ‘দ্য স্কুপ’ অনুষ্ঠানে অঞ্জলি দোশির সঙ্গে আলাপচারিতায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আর্থিক কাঠামোর বিষয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন ডেরিং। তার দাবি, ১৯৯৭ সালে দ্বিপক্ষীয় সিরিজের আর্থিক কাঠামোয় যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, সেটিই মূলত ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এই প্রসঙ্গে ডেরিং বলেন, ‘ভারতে সিরিজটি হচ্ছে বলেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট এখান থেকে কিছু পাচ্ছে না। ভারতে একটি সিরিজ থেকে দুই থেকে তিন কোটি ডলার আয় হতে পারে, অথচ সেই আয় থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের প্রাপ্তি শূন্য।’

তবে বিষয়টি এমন নয় যে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে বঞ্চিত করছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রচলিত আর্থিক নিয়ম অনুযায়ী, দ্বিপক্ষীয় সিরিজের সম্প্রচারস্বত্ব থেকে প্রাপ্ত যাবতীয় আয় আয়োজক বোর্ডই নিজেদের কাছে রাখতে পারে। ফলে ভারতের মতো বিশাল বাণিজ্যিক বাজারের দেশগুলো বড় অঙ্কের অর্থ আয় করলেও, সফরকারী দল হিসেবে তুলনামূলক ছোট ক্রিকেট বোর্ডগুলো সেই আয়ের কোনো ভাগ পায় না।

এই ব্যবস্থার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে গিয়ে ডেরিং ১৯৯৭ সালের কথা স্মরণ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বছর দ্বিপক্ষীয় সিরিজের আর্থিক কাঠামো পরিবর্তনের একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছিল, যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৯-১ ভোটে পরাজিত হয়। সেই সিদ্ধান্তের পর থেকেই আয়োজক বোর্ডগুলো সম্প্রচারস্বত্বের সম্পূর্ণ আয় নিজেদের পকেটে রাখার সুযোগ পায়।

এর আগে দ্বিপক্ষীয় সিরিজে সফরকারী দলকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করত আয়োজক বোর্ড। সে সময় ক্রিকেট বিশ্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকায় বিদেশ সফর থেকে ক্যারিবীয় বোর্ড মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করত। অনেক ক্ষেত্রে সেই আয় ঘরের মাঠে সিরিজ আয়োজনের আয়ের চেয়েও বেশি হতো।

কিন্তু নিয়ম পরিবর্তনের ফলে বড় বাজারের দেশ এবং ছোট ক্রিকেট বোর্ডগুলোর আয়ের ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে বলে মনে করেন ডেরিং।

তিনি বলেন, ‘এর ফলে ১৫০ কোটি মানুষের দেশ ভারত নিজেদের বাজার থেকে পাওয়া পুরো আয় রাখতে পারে। অথচ ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নির্ভর করতে হয় অ্যান্টিগার প্রায় এক লাখ কিংবা সেন্ট কিটসের প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বাজার থেকে পাওয়া আয়ের ওপর।’

সেই পুরনো সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে ডেরিং আরও বলেন, ‘এটি স্পষ্টতই অন্যায্য ছিল। আমরা ৯-১ ভোটে হেরে গিয়েছিলাম। তখনই বলেছিলাম, এই সিদ্ধান্ত কার্যত ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের পতনের পথ তৈরি করেছে। কারণ, এতে আমাদের আয়ের প্রধান উৎসটি হারিয়ে গেছে।’

আর্থিক সংকটের এই প্রভাব এখন সরাসরি প্রভাব ফেলছে ক্যারিবীয় ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিকের ওপর। গত সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের কেন্দ্রীয় চুক্তির নির্ধারিত পারিশ্রমিক ২৫ শতাংশ কমানোর ঘোষণা দিয়েছে ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ। যদিও তাদের ১২ মাসের চুক্তির মেয়াদ বহাল রাখা হয়েছে। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে চুক্তির মেয়াদ ১২ মাস থেকে কমিয়ে মাত্র সাত মাস করা হয়েছে।

খরচ কমানোর তাগিদে পুরুষদের সুপার৫০ এবং নারীদের টি-টোয়েন্টি ব্লেজ প্রতিযোগিতাও স্থগিত করেছে ক্যারিবীয় বোর্ড। এমন চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রচলিত আয় বণ্টনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন ডেরিং।

আর্থিক টানাপোড়েন থাকলেও মাঠে ভারতের বিপক্ষে দুর্দান্ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বুধবার (১৪ অক্টোবর) হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত চতুর্থ টি-টোয়েন্টিতে শাই হোপের অপরাজিত সেঞ্চুরি এবং কিমো পলের পাঁচ উইকেটের দাপটে ভারতকে ২৪ রানে পরাজিত করেছে ক্যারিবীয়রা। এর মাধ্যমে সিরিজে ২-২ সমতা ফিরিয়েছে তারা। আগামী শনিবার (১৭ অক্টোবর) বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত হবে সিরিজের শেষ ম্যাচ, যেখানেই নির্ধারিত হবে চূড়ান্ত বিজয়ী।