আলোচিত লেখক এবং সামাজিক অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য ডক্টর অব ফিলোসফি (পিএইচডি) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। চীনের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো, রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং পুঁজিবাদের ক্রমবিকাশ নিয়ে তিনি তার গবেষণাপত্রটি সম্পন্ন করেন। তার এই গবেষণাপত্রের শিরোনাম হলো ‘Sovereign Accumulation: How China Sustains Capitalism Without a Bourgeoisie’।
সাড়ে চার বছরব্যাপী পরিচালিত এই দীর্ঘ গবেষণায় পিনাকী ভট্টাচার্য তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করেছেন যে, প্রচলিত বুর্জোয়া শ্রেণির উপস্থিতি ছাড়াই চীনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কীভাবে টিকে রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, তিনি ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট’-এর অধীনে তার এই উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করেন। পুরো গবেষণা প্রক্রিয়ায় তার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ছিলেন অধ্যাপক টবিয়াস ডি কোনিং।
তার এই গবেষণায় চীনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা, পুঁজি সঞ্চয়ের বিশেষ প্রক্রিয়া এবং পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থার ধারাবাহিকতার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে স্থান পেয়েছে। গবেষণাপত্রটির বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়—‘সার্বভৌম সঞ্চয়: বুর্জোয়া শ্রেণি ছাড়াই চীন কীভাবে পুঁজিবাদ টিকিয়ে রাখে’। সাধারণত প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ব্যক্তিমালিকানাধীন পুঁজিপতি এবং বুর্জোয়া শ্রেণিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। চীনের অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রেক্ষিতে এই ধারণাটি কীভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব, সেটিই ছিল তার গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দু।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে চীনের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের সক্রিয় অংশগ্রহণ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রভাব, বিনিয়োগের দিকনির্দেশনা এবং বাজারব্যবস্থার সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গবেষণার শিরোনাম থেকেই এটি স্পষ্ট যে, চীনের পুঁজিবাদী বিকাশের বৈশিষ্ট্য ও গতিপ্রকৃতি অনুধাবনের লক্ষ্যে পিনাকী ভট্টাচার্য একটি গভীর তাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালিয়েছেন।
পিনাকী ভট্টাচার্যের জন্ম বগুড়া জেলায়। তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। তার বাবা শ্যামল ভট্টাচার্য বগুড়া জেলা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন এবং মা সুকৃতি ভট্টাচার্য ছিলেন একজন গৃহিণী। তিনি তার বাবা-মায়ের জ্যেষ্ঠ সন্তান।
ছাত্রজীবনেই পিনাকী ভট্টাচার্য নেতৃত্বের গুণাবলি প্রদর্শন করেন। তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) নির্বাচনে জয়লাভ করেন এবং ওই সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশোনার পাশাপাশি চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বমূলক সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা তার কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে বিবেচিত হয়।
চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করলেও পরবর্তী সময়ে তিনি লেখালেখি, সামাজিক অ্যাক্টিভিজম এবং বিভিন্ন পেশাগত কর্মকাণ্ডে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হন। ২০১৮ সালে ফ্যাসিবাদী শাসনামলের কারণে তিনি দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। তবে প্রবাস জীবন কিংবা শরণার্থী জীবন তার জ্ঞানতৃষ্ণা ও অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি। ২০২১ সালে তিনি ফ্রান্সের প্রখ্যাত সরবোন বিজনেস স্কুল থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
এরপর তিনি ফ্রান্সভিত্তিক বহুজাতিক প্রসাধনসামগ্রী প্রতিষ্ঠান লরিয়াল-এর ডার্মাটোলজিক্যাল বিউটি ডিভিশনে মেডিকেল রিলেশনস স্পেশালিস্ট হিসেবে গ্লোবাল মেডিকেল রিলেশনস বিভাগে কাজ শুরু করেন। বর্তমানেও তিনি ওই পদে কর্মরত আছেন।
পেশাগত ব্যস্ততার পাশাপাশি তিনি অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে তার এই ডক্টরেট পর্যায়ের গবেষণাটি সম্পন্ন করেন। এর ফলে চিকিৎসাশাস্ত্র থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনা এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে তার শিক্ষাজীবনে বহুশাস্ত্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়নের এক অনন্য অভিজ্ঞতা যুক্ত হলো।
পারিবারিক জীবনে পিনাকী ভট্টাচার্যের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা বেগম পেশায় একজন চিকিৎসক। তাঁদের একমাত্র পুত্র সন্তান ঋষভ আঞ্জুমান শুভ।
লেখকের হিসেবে তিনি বেশ জনপ্রিয়। তিনি ‘স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ’, ‘ফুলকুমারী’, ‘মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম’সহ আরও অনেক গ্রন্থের রচয়িতা।