বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে স্ত্রীকে সাম্পানে তুলে কর্ণফুলী নদীতে নিয়ে যান স্বামী। সেখানে সহযোগীদের সহায়তায় শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপর নিথর দেহটি হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দি করে খালে ফেলে দেওয়া হয়। ঘটনার আড়াই মাস পর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এই ঘটনায় জড়িত দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তবে মামলার প্রধান অভিযুক্ত স্বামী রাজা মিয়া এখনো পলাতক; তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করে।

তদন্তে জানা গেছে, গত ২ আগস্ট চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার কালারপোল এলাকার এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছনে শিকলবাহা খাল থেকে বস্তাবন্দি এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে সদরঘাট নৌ পুলিশ। বিদ্যুৎকেন্দ্রের লঞ্চঘাটসংলগ্ন অংশে মরদেহটি ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়। উদ্ধারকালে দেখা যায়, ওই নারীর হাত ও পা শক্ত করে বাঁধা ছিল। পরবর্তীতে পরিচয় শনাক্ত হলে জানা যায়, নিহতের নাম জান্নাতুল ফেরদৌস (২৮)।

পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, জান্নাতুল ফেরদৌস তার প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাজা মিয়াকে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় রাজা মিয়া নিজেকে অবিবাহিত হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে দাম্পত্য জীবনের কিছুকাল পরেই জান্নাতুল জানতে পারেন যে, রাজা মিয়ার আগে থেকেই একজন স্ত্রী রয়েছেন। এই সত্য সামনে আসার পর তাদের মধ্যে তীব্র পারিবারিক কলহ ও বিরোধ শুরু হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, এই বিরোধের জের ধরেই জান্নাতুলকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।

পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর অন্য পাড়ে ব্রিজঘাট এলাকায় নিয়ে যান রাজা মিয়া। সেখানে আগে থেকেই একটি সাম্পান নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন মোসলেম উদ্দিন, রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর ভাই শুকুর আহম্মদ এবং আরও একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি।

এরপর তারা জান্নাতুল ও রাজা মিয়াকে নিয়ে সাম্পানে করে কর্ণফুলী সেতুর নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালের দিকে রওনা হন। রাত ৮টার পর সাম্পানে থাকা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পিবিআই জানিয়েছে, একপর্যায়ে রাজা মিয়া জান্নাতুলের মোবাইল ফোনটি কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেন এবং তার মুখ চেপে ধরেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ঠিক সেই মুহূর্তেই সহযোগীরা সাম্পানে থাকা একটি ব্যাগ থেকে রশি ও বস্তা বের করেন। এরপর রশি দিয়ে গলা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে জান্নাতুলকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর তার হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দি করে মরদেহটি খালে ফেলে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর জান্নাতুলের মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে রাজা মিয়া ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কর্ণফুলী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

পিবিআই কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান আরও জানান, এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করে গত বুধবার আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন মোসলেম উদ্দিন। তাকে ওই দিনই গ্রেপ্তার করা হয়। মোসলেম উদ্দিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপর সহযোগী শুকুর আহম্মদকেও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। তবে মামলার মূল হোতা ও প্রধান অভিযুক্ত রাজা মিয়াকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।