বেড়ানোর কথা বলে স্ত্রীকে সাম্পানে তোলা এবং পরবর্তীতে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে মরদেহ বস্তাবন্দী করে খালে ফেলে দেওয়ার এক নৃশংস ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। নিহত নারীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস (২৮)। মরদেহ উদ্ধারের আড়াই মাস পর এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা প্রকৃত রহস্য ও পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা।
এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ দুজনকে শনাক্ত করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে একজন গতকাল বুধবার আদালতের সামনে নিজের অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে মামলার প্রধান অভিযুক্ত রাজা মিয়া এখনো পলাতক রয়েছেন এবং তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত জানাতে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাজা মিয়াকে বিয়ে করেন জান্নাতুল। বিয়ের সময় রাজা মিয়া নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে বিয়ের কিছুদিন পর জান্নাতুল জানতে পারেন, রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রী রয়েছেন। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এর জেরেই জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।”
তদন্তকারী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান আরও জানান, পূর্বপরিকল্পিত এই ষড়যন্ত্র অনুযায়ী চলতি বছরের ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ছয়টার দিকে বেড়ানোর কথা বলে জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর অন্য পাড়ে ব্রিজঘাট এলাকায় নিয়ে যান রাজা মিয়া। সেখানে আগে থেকেই সাম্পান নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন মুসলিম উদ্দিন, রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর ভাই শুকুর আহম্মদ এবং অজ্ঞাতনামা আরও একজন ব্যক্তি। জান্নাতুলকে সেখানে নিয়ে আসা হলে তাঁরা সবাই মিলে সাম্পানে ওঠেন। এরপর সাম্পানটি কর্ণফুলী সেতুর নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালে প্রবেশ করে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, রাত আটটার পর সাম্পানের ভেতরেই রাজা মিয়ার সঙ্গে জান্নাতুলের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে রাজা মিয়া জান্নাতুলের মুঠোফোনটি কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেন এবং তাঁর মুখ চেপে ধরেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অন্য এক সহযোগী সাম্পানে রাখা ব্যাগ থেকে রশি ও বস্তা বের করেন। রশি দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ধরলে জান্নাতুলের মৃত্যু হয়। এরপর তাঁর হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দী করে খালে ফেলে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পিবিআই-এর প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কর্ণফুলী থানার কালারপোল এলাকায় এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছনে শিকলবাহা খালে জান্নাতুলের মরদেহটি ফেলে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ২ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের লঞ্চঘাটসংলগ্ন খালে ভাসমান অবস্থায় বস্তাবন্দী ও হাত-পা বাঁধা এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে সদরঘাট নৌ পুলিশ।
মরদেহ উদ্ধারের পর জান্নাতুলের পরিচয় শনাক্ত হয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর জান্নাতুলের মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে রাজা মিয়া ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কর্ণফুলী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পিবিআই কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান আরও জানান, গত বুধবার এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন মুসলিম উদ্দিন। তাঁকে বুধবারই গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুকুর আহম্মদকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে প্রধান অভিযুক্ত রাজা মিয়াকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশি অভিযান চলছে।