চুক্তি শুনেই হকচকিয়ে যাচ্ছেন নিশ্চয়ই। ভাবছেন কিসের চুক্তি থাকে আকাশের সঙ্গে। এক দেশের এয়ারক্রাফট অন্য দেশে যেতে হলে দুটি দেশের মধ্যে এয়ার সার্ভিস অ্যাগ্রিমেন্ট (এএসএ) করতে হয়। তেমনি বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বের বহু দেশের এয়ার সার্ভিস অ্যাগ্রিমেন্ট আছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি দরজা অনেকটাই খোলা। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে আমরা কতটা এগোতে পেরেছি, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সঙ্গে ৫৫টি দেশের দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল চুক্তি রয়েছে। অথচ দেশীয় এয়ারলাইনগুলোর আন্তর্জাতিক উপস্থিতি এখনো সীমিত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, চুক্তি আছে, বাজার আছে, যাত্রী আছে; তাহলে বাংলাদেশের এয়ারলাইনগুলো সেই বাজারের পুরোটা ধরতে পারছে না কেন?

সমস্যার একটি অংশ সক্ষমতার। কিন্তু পুরো গল্প তা নয়। একটি নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু করার আগে এয়ারলাইনকে হিসাব করতে হয়, উড়োজাহাজ আছে কি না, পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া যাবে কি না, কার্গো সম্ভাবনা কেমন, বিমানবন্দর ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের খরচ কত, অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ কত, কর-ভ্যাটসহ পরিচালন ব্যয় কত এবং শেষ পর্যন্ত রুটটি লাভজনক হবে কি না। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক রুটে উড়তে হলে শুধু আকাশের অনুমতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ব্যবসা করার অনুকূল পরিবেশ। এখানেই সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের অনেক দেশ তাদের জাতীয় বিমান সংযোগকে কেবল বেসরকারি ব্যবসার বিষয় হিসেবে দেখে না; নতুন রুট চালু, পর্যটন বাড়ানো কিংবা নিজেদের এয়ারলাইনগুলোকে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলতে বিভিন্ন ধরনের নীতিগত ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও দেশীয় এয়ারলাইনগুলো নতুন আন্তর্জাতিক রুটে বিনিয়োগ করতে চাইলে বিমানবন্দর চার্জ, কর, ভ্যাট, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংসহ সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ আছে।

এটি কোনো বিশেষ এয়ারলাইনকে সুবিধা দেওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং দেশের নিজস্ব এয়ারলাইন সক্ষমতা তৈরি করার প্রশ্ন।

উড়োজাহাজ আসছে, কিন্তু গন্তব্যের পরিকল্পনা কতটা পরিষ্কার

বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে এখন সবচেয়ে বড় আশাবাদের জায়গাগুলোর একটি হলো নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে বর্তমানে ১৯টি বিমান রয়েছে। ২০২৬ সালে বোয়িংয়ের সঙ্গে দুই দফায় বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ২৫টি এয়ারক্রাফট এবং সম্প্রতি এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি এয়ারক্রাফট ক্রয়ের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ফলে বাংলাদেশ বিমানের এয়ারক্রাফট দাঁড়াবে সর্বমোট ৫৪টি। এটি নিঃসন্দেহে বড় একটি সম্ভাবনা।

কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন করতেই হয়—উড়োজাহাজ কেনার সঙ্গে কি গন্তব্যের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে? একটি উড়োজাহাজ কেনা মানে শুধু একটি সম্পদ কেনা নয়; বিমানটি প্রতিদিন কত ঘণ্টা উড়বে, কোন রুটে যাবে, সেই রুটে কত যাত্রী থাকবে, কত ভাড়া পাওয়া যাবে, কার্গো কত হবে এবং বিনিয়োগের অর্থ কীভাবে ফেরত আসবে—এসবের ওপরই নির্ভর করবে সেই বিনিয়োগের সাফল্য।

তাই আমাদের প্রয়োজন শুধু ফ্লিট এক্সপানশন প্ল্যান নয়, ডেসটিনেশন এক্সপানশন প্ল্যানও। যেমন, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বহরে বর্তমানে এয়ারক্রাফট আছে ২৫টি। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ২১টি বোয়িং এয়ারক্রাফট যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, নতুন বিমান দিয়ে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে নেটওয়ার্ক বাড়ানো হবে। অর্থাৎ নতুন বিমান আসার সঙ্গে নতুন বাজার ধরার পরিকল্পনাও সামনে রাখা হচ্ছে।

এ ধরনের প্রতিযোগিতা দেশের জন্য ভালো। কারণ, একটি দেশীয় এয়ারলাইনগুলো যত বড় আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারবে, বিদেশি ক্যারিয়ারের ওপর নির্ভরতা তত কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

ঢাকার বাইরেও যদি আকাশ খুলে দেওয়া যায়

আসি এবার অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলোর আলোচনায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে এখন নির্বাচিত সরকারের সময়ে এ বিমানবন্দরগুলোর নাম বেশ শোনা যাচ্ছে। বলা যায়, বাংলাদেশের এভিয়েশন সম্ভাবনার আরেকটি বড় জায়গা ঢাকার বাইরে।

সরকার আটটি স্টল পোর্ট (স্বল্প দূরত্বে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে সক্ষম): বগুড়া, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, ঈশ্বরদী, শমশেরনগর, খানজাহান আলী, কুমিল্লা ও পটুয়াখালীকে ধাপে ধাপে দেশীয় বিমানবন্দরে রূপ দেওয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। এর লক্ষ্য জাতীয় পর্যায়ে একটি এয়ার কানেক্টিভিটি গ্রিড তৈরি করা। এটি শুধু বিমানবন্দর নির্মাণের প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব বোঝা যাবে না।

ধরা যাক, বগুড়া বা ঈশ্বরদী থেকে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু হলো। উত্তরাঞ্চলের একজন ব্যবসায়ীকে প্রতিবার ঢাকায় এসে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ধরতে হবে না। কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসার সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ বাড়তে পারে। পর্যটন বাড়তে পারে। নতুন বিনিয়োগকারীরাও কোনো অঞ্চলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিমান যোগাযোগকে অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।

ঈশ্বরদীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। অতীতে কম যাত্রীর কারণে সেখানকার বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ হয়েছিল। অর্থাৎ বিমানবন্দর তৈরি করলেই হবে না; কোন অঞ্চলে কী ধরনের চাহিদা তৈরি হয়েছে, সেটিও বুঝতে হবে। এ কারণেই বিমানবন্দর উন্নয়নের সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি, পর্যটন, শিল্প, কৃষি, কার্গো এবং এয়ারলাইন রুট পরিকল্পনাকে একসঙ্গে দেখতে হবে।

সরকার যদি এ কাজ করতে পারে, তাহলে আজকের অব্যবহৃত রানওয়েগুলো আগামী দিনের আঞ্চলিক অর্থনীতির প্রবেশদ্বার হতে পারে। ‘আকাশ জয় করে উড়োজাহাজ, আর সেই আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখে মানুষ।’

এভিয়েশন খাতে আমাদের আলোচনায় সাধারণত উড়োজাহাজ কেনা, বিমানবন্দর নির্মাণ বা নতুন রুটের কথা বেশি আসে। কিন্তু একটি দেশের এভিয়েশন ইকোসিস্টেমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো দক্ষ মানুষ। পাইলট, এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার, সেফটি প্রফেশনাল, কেবিন ক্রু, ফ্লাইট ডিসপ্যাচার, গ্রাউন্ড সার্ভিস, কাস্টমার সার্ভিস—প্রতিটি স্তরেই দক্ষ জনবল প্রয়োজন।

বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে নতুন বিমান আসছে, অন্যদিকে দেশীয় এয়ারলাইনগুলো বহর বাড়ানোর সাহস দেখাচ্ছে। দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ চলছে। আবার সরকারও ঢাকার বাইরে নতুন বিমান যোগাযোগ তৈরির সম্ভাবনা যাচাই করছে।

এ জায়গায় দেশীয় বেসরকারি খাতের কিছু উদ্যোগ আশার জায়গা তৈরি করছে। ইউএস–বাংলা এয়ারলাইনসের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে ২৮ জন ক্যাডেট পাইলটকে যুক্তরাষ্ট্রে এটিপিএল ও সিপিএল প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়েছে; তাঁরা প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে ফাস্ট অফিসার হিসেবে যোগ দিয়েছেন। একইভাবে ১৮ জন এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ারকে ভারতের ঠাকুর ইনস্টিটিউট অব এভিয়েশন টেকনোলজিতে পাঠানো হয়েছে; তাঁদের একটি অংশ ইতিমধ্যে দেশে ফিরে কাজে যোগ দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি আরও প্রায় ২০০ ক্যাডেট পাইলট ও ১০০ এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

এ ধরনের বিনিয়োগের মূল্য শুধু একটি কোম্পানির জন্য নয়। আজ যে তরুণ নিজের দেশের একটি এয়ারলাইনের অর্থায়নে বিদেশে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, আগামী দিনে তাঁর দক্ষতা বাংলাদেশের পুরো এভিয়েশন খাতেই কাজে লাগবে। একজন দক্ষ পাইলট বা প্রকৌশলী তৈরি হতে বছরের পর বছর সময় লাগে। তাই নতুন বিমান আসার আগেই দক্ষ জনবল তৈরির কাজ শুরু করা জরুরি।

এখানে রাষ্ট্রেরও বড় ভূমিকা আছে। প্রশিক্ষণ অবকাঠামো, লাইসেন্সিং, এভিয়েশন একাডেমি, সিমুলেটর ফ্যাসিলিটি, মেইনটেন্যান্স ইকোসিস্টেম এসব জায়গায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব তৈরি করা গেলে বাংলাদেশকে দক্ষ জনবলের একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা সম্ভব।

এভিয়েশনকে খরচ নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে

এভিয়েশন খাতে বিনিয়োগ মানে শুধু বিমান বা বিমানবন্দরে টাকা খরচ করা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান, পর্যটন, ব্যবসা, রপ্তানি, আমদানি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। তাই নতুন বিমানবন্দর চালু করা, বিমানবন্দর চার্জে যৌক্তিকতা আনা কিংবা দেশীয় এয়ারলাইনকে নতুন রুটে উৎসাহ দেওয়া—এসবকে কেবল সরকারি ব্যয় হিসেবে দেখলে চলবে না। দেখতে হবে, এর বিপরীতে কতটা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হচ্ছে।

অবশ্যই প্রতিটি প্রকল্পের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। যেখানে যাত্রী নেই, সেখানে শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিমানবন্দর চালু করা ঠিক হবে না। সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য—ঝুঁকি না নিলে নতুন বাজার তৈরি হয় না। সরকারের কাছে তাই প্রত্যাশা আরও একটু বেশি।

বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে নতুন বিমান আসছে, অন্যদিকে দেশীয় এয়ারলাইনগুলো বহর বাড়ানোর সাহস দেখাচ্ছে। দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ চলছে। আবার সরকারও ঢাকার বাইরে নতুন বিমান যোগাযোগ তৈরির সম্ভাবনা যাচাই করছে।

এ মুহূর্তে সরকারের কাছে এয়ারলাইনগুলোর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হয়তো কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; বরং একটি সহায়ক ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতি–পরিবেশ। নতুন আন্তর্জাতিক রুটে যাওয়ার ক্ষেত্রে যৌক্তিক চার্জ কাঠামো, প্রয়োজনীয় রেগুলেটরি সাপোর্ট, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো এবং বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা—এসব নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় এয়ারলাইনগুলো আরও বড় ঝুঁকি নেওয়ার সাহস পাবে।

তখন সরকারকে প্রতিটি রুটের ব্যবসা চালাতে হবে না; বরং এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে দেশের এয়ারলাইনগুলো নিজেরাই নতুন রুট খুঁজে নিতে পারে। কারণ, শেষ পর্যন্ত একটি দেশের আকাশ তার নিজের অর্থনীতিরও অংশ। বাংলাদেশের সঙ্গে ৫৫টি দেশের বিমান চলাচল চুক্তি থাকতে পারে। আমাদের বহরে নতুন বিমান আসতে পারে। নতুন বিমানবন্দরও তৈরি হতে পারে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকলে সম্ভাবনাগুলো আলাদা আলাদা দ্বীপ হয়েই থাকবে।

আর যদি রাষ্ট্র, এয়ারলাইন, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং বেসরকারি খাত একসঙ্গে এগোতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের আকাশপথ শুধু যাত্রী বহন করবে না; নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান, নতুন বিনিয়োগ ও নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বহন করবে।

সেদিন হয়তো আমাদের আর প্রশ্ন করতে হবে না,‘বাংলাদেশের উড়োজাহাজ কোথায় উড়ছে?’বরং প্রশ্ন হবে, বাংলাদেশের উড়োজাহাজ আর কোথায় উড়তে পারে? সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এখনই।

জুবাইয়া ঝুমা পিআর প্রফেশনাল

মতামত লেখকের নিজস্ব