সারা দেশে বিরাজমান সারসংকট এবং সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এনে তদন্তের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সাথে সার ডিলার নিয়োগ এবং সার বিতরণ ব্যবস্থায় পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৬ দফার একটি দাবিপত্র পেশ করেছে দলটি।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর মগবাজার এলাকায় অবস্থিত দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই দাবিগুলো জানানো হয়। ব্রিফিংয়ে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘দেশের সার ডিলার নিয়োগে বিদ্যমান সরকারি নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে চরম দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে। শর্ত না মেনে, এমনকি টাকার বিনিময়ে ও রাজনৈতিক প্যাডে তালিকা দিয়ে ডিলারশিপ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।’

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বিএনপি নেতাদের অর্থ আদায়ের প্রবণতা এবং স্বজনপ্রীতির কারণে ডিলার নিয়োগের সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের কৃষি খাতের ওপর এবং সাধারণ কৃষকরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

জেলা পর্যায়ের কমিটি গঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জেলা পর্যায়ের কমিটিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় সদস্য মনোনীত করায় যোগ্য ব্যক্তিরা সুযোগ পাচ্ছেন না।’

‘দ্য ডিসেন্ট’ নামক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, ডিলার নিয়োগে চরম অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে। সেখানে ভুয়া গুদাম তৈরি, ভুয়া চুক্তিনামা প্রস্তুত করা, এক এলাকার বাসিন্দাকে অন্য এলাকায় ডিলারশিপ প্রদান এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে লাইসেন্স দেওয়ার মতো গুরুতর ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।

সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে জামায়াতে ইসলামী নিম্নোক্ত ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেছে:

১. সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অবিলম্বে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

২. ডিলার নিয়োগে যোগ্যতা মূল্যায়নের মানদণ্ড, তালিকা প্রণয়ন প্রক্রিয়া এবং লাইসেন্স প্রদানের ভিত্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

৩. ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে অর্থ আদায়ের অভিযোগগুলো তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪. সারসংকট নিয়ে দায়িত্বশীলদের বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ের প্রকৃত পরিস্থিতির অসংগতি যাচাই করে সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে।

৫. নিয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষকে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং তদন্তের অগ্রগতি জনগণকে জানাতে হবে।

৬. রাজনৈতিক বা ভিত্তিহীন বক্তব্যের মাধ্যমে কাউকে দায়ী না করে, প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ যাচাই করতে হবে।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে যে মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রত্যাশা ছিল, তা বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের নীতির কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’

সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলগুলোকে বাদ দিয়ে একটি কর্তৃত্ববাদী কাঠামো তৈরির চেষ্টার তীব্র নিন্দা জানান তিনি। রাজপথে বিতর্ক সৃষ্টি না করে আগামী সংসদ অধিবেশনে গণভোটে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

পাশাপাশি সার, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে নিত্যপণ্যের দাম যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান গোলাম পরওয়ার।

উক্ত ব্রিফিংয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার/মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ দলের অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।