তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভারত ও চীনের ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের সম্মুখীন হয়েছে। সম্প্রতি এ প্রকল্প নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেরও কিছু আগ্রহ দৃশ্যমান হয়েছে। তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প কীভাবে ভূরাজনৈতিক খেলায় পরিণত হয়েছে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব কীভাবে এড়ানো যায়, তা নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন নজরুল ইসলাম । আজ প্রকাশিত হলো শেষ পর্ব
পাওয়ারচায়নার তিস্তা প্রকল্পের পর্যালোচনাকালে আমি এবং পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিষয়ের অধ্যাপক ড. খালেকুজ্জামান শুধু এর বিভিন্ন ত্রুটি উন্মোচনে সীমাবদ্ধ ছিলাম না। আমরা একটি বিকল্পও তুলে ধরেছিলাম। এই বিকল্পের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ ছিল নিম্নরূপ—
১. বলপূর্বক একটি বিনুনি নদীকে এক খাতবিশিষ্ট নদীতে রূপান্তরের লক্ষ্য পরিত্যাগ করা;
২. একলাফে নদীর গড় প্রশস্ততা প্রায় ৩ কিলোমিটার থেকে ৮১৬ মিটারে হ্রাসের লক্ষ্য বর্জন;
৩. আশু করণীয় হিসেবে নদীভাঙন রোধকে অগ্রাধিকার প্রদান;
৪. সূচনায় বিগত প্রায় এক দশক ধরে তিস্তাপাড়ের যেসব বিন্দু স্থিতিশীল বলে প্রমাণিত হয়েছে সেগুলো ধরে তিস্তার একটি কাঙ্ক্ষিত ‘প্রাথমিক স্থিতিশীল পাড়’ প্রতিষ্ঠা করা;
৫. এই পাড় প্রতিষ্ঠার জন্য পশ্চিমা ধাঁচের কঠিন স্থাপনার পরিবর্তে জিও ব্যাগ এবং অন্যান্য উপযোগী দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার;
৬. প্রাথমিক স্থিতিশীল পাড় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিস্তার যেসব অংশে প্রশস্ততা অযাচিতভাবে বেশি বলে বিবেচিত হয়, সেসব স্থানে আরও জিও ব্যাগের স্তর যোগের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে প্রশস্ততা হ্রাস;
৭. তিস্তার প্রশস্ততা নদীর সর্বত্র যান্ত্রিকভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে নির্ধারিত করার পরিবর্তে নদীর বিভিন্ন স্থানের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হওয়ার সুযোগ রাখা এবং নদীর বাঁক ও প্রশস্ততা নির্ধারণে নদীর নিজস্ব আচরণকে ভূমিকা রাখার সুযোগ প্রদান;
৮. উন্মুক্ত পন্থার অনুসরণে তিস্তার সঙ্গে প্লাবনভূমির এবং সব শাখা ও উপনদীর সংযোগের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং গোটা তিস্তা অববাহিকার পুনরুজ্জীবন ও বিচ্ছুরিত জলাধারে রূপান্তর;
৯. নদীতে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত চর সম্পর্কে নমনীয়তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ;
১০. তিস্তা নদীর আরাধ্য রূপান্তর সম্পর্কে স্থানীয় জনগণকে পূর্ণরূপে অবহিত করা, এই রূপান্তরের বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট দিক সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের মতামতের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদান এবং এ প্রকল্পের বাস্তবায়নে তাঁদের প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণের যথাসম্ভব সুযোগ সৃষ্টি করা।
এই বিকল্প প্রস্তাবের পেছনে দর্শনটি হলো নদ–নদীর প্রতি প্রকৃতিসম্মত পন্থা, নদীকে প্রতিপক্ষ ভাবা এবং নদীর বিরুদ্ধাচরণ করা নয়; বরং নদীকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে গ্রহণ করে নদীর সহযোগিতা–সহকারে নদীর ব্যবস্থাপনা করা।
► তিস্তা প্রকল্পকে ভূরাজনীতির ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে এবং তার উপায় হলো দেশীয় সক্ষমতার ভিত্তিতে এই প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।
► জাতীয় সক্ষমতার ভিত্তিতে তিস্তা সমস্যা সমাধানের চিন্তা সঠিক। সেই লক্ষ্যে কী ধরনের জাতীয় সক্ষমতার সন্ধান করতে হবে, তার প্রতিও মনোযোগ দিতে হবে।
লক্ষণীয়, পাওয়ারচায়নার প্রকল্পে তিস্তাকে ৮১৬ মিটারে সংকীর্ণ করার প্রস্তাবটি ছিল সম্পূর্ণরূপে গ্রোয়েননির্ভর। এতে নদীর দুই তীরে মোট ৫০টি নতুন গ্রোয়েন নির্মাণ এবং ১৫টি পুরোনো গ্রোয়েন পুনর্নির্মাণের কথা বলা হয়। গ্রোয়েন হলো কংক্রিট দ্বারা নির্মিত কঠিন স্থাপনা, যা পশ্চিমের দেশসমূহে ব্যবহৃত হয়েছে। কঠিন স্থাপনার অন্যান্য উদাহরণ হলো স্পার, হার্ড পয়েন্ট, কংক্রিট রিভেটমেন্ট ইত্যাদি। যমুনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদ–নদীর পাড়ভাঙন রোধে এগুলো ব্যবহৃত হয়েছে; কিন্তু কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।
ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ: পাস্ট, প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার এবং বাংলাদেশে পানি উন্নয়ন: বর্তমান ধারার সংকট এবং বিকল্প পথের প্রস্তাব বই দুটিতে আমি কঠিন স্থাপনা বনাম জিও ব্যাগ প্রযুক্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এখানে তার পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই।
সংক্ষেপে বলা দরকার, কঠিন স্থাপনাসমূহ অনমনীয়। একবার নির্মিত হলে এগুলোর পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও বিভাজনের কোনো সুযোগ থাকে না। পক্ষান্তরে জিও ব্যাগ প্রযুক্তি পোক্ত কিন্তু নমনীয় এবং এতে বিভাজন ও সংযোজন-বিয়োজনের সুযোগ থাকে। বালু ও জিও টেক্সটাইল উভয়ই বাংলাদেশে সুলভ ও সহজলভ্য। ফলে কঠিন স্থাপনার তুলনায় জিও ব্যাগ প্রযুক্তি অত্যন্ত স্বল্প ব্যয়সাপেক্ষ।
সম্প্রতি পাবনা সেচ প্রকল্প, মেঘনা-ধনাগোদা প্রকল্প এবং মেঘনা-যমুনা নদীভাঙন প্রশমন প্রকল্পে জিও ব্যাগ ব্যবহার করে তুলনামূলকভাবে ভালো ফল পাওয়া গেছে। এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গবেষকেরা দেখিয়েছেন, যেখানে সিরাজগঞ্জের কংক্রিট ব্লকভিত্তিক রিভেটমেন্ট এবং বেতিল-এনায়েতপুরের স্পার নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে খরচ পড়েছে যথাক্রমে ৬৭৮ এবং ২৭৯ কোটি টাকা, সেখানে কালীতলাতে জিও ব্যাগভিত্তিক রিভেটমেন্ট নির্মাণে খরচ পড়েছে প্রতি কিলোমিটার মাত্র ২৮ কোটি টাকা।
প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার প্রথম ১০ বছরের মধ্যে সিরাজগঞ্জ রিভেটমেন্ট এবং বেতিল-এনায়েতপুরের স্পারের জন্য মেরামত ও পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন হয়েছে যথাক্রমে ৬ ও ৭ বার এবং এর জন্য ব্যয় হয়েছে প্রকল্পের আদি বাস্তবায়ন খরচের যথাক্রমে ৩০ ও ১২০ শতাংশ। বিপরীতে কালীতলা জিও ব্যাগ রিভেটমেন্টের জন্য এই উভয় সংখ্যা হচ্ছে শূন্য। কাজেই বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনায় কঠিন স্থাপনার তুলনায় জিও ব্যাগ প্রযুক্তির উপযোগিতা অকাট্যভাবেই প্রমাণিত হয়েছে। লক্ষণীয়, তিস্তা নদীর পাড়ভাঙন রোধে আগে ১৫টি গ্রোয়েন নির্মিত হয়েছিল; কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। তা সত্ত্বেও কীভাবে বাংলাদেশের পানি কর্তৃপক্ষ পাওয়ারচায়নার সম্পূর্ণ গ্রোয়েননির্ভর প্রকল্প নিয়ে উৎসাহিত হলো, তা আশ্চর্যের বিষয়।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার আগের আওয়ামী লীগ সরকারের মতো ভারতঘনিষ্ঠ ছিল না। কাজেই ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পাওয়ারচায়নার প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে এই সরকারের তেমন সমস্যা ছিল না। বস্তুত এই সরকার পাওয়ারচায়নার প্রকল্প নিয়ে বেশ উৎসাহও দেখায়।
মুহাম্মদ ইউনূস চীন সফরকালে ঘোষণা করেন যে চীনের সহযোগিতার ভিত্তিতেই পাওয়ারচায়নার প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। শুধু তা–ই নয়, তিনি চীনা কর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশের নদ–নদীর জন্য ৫০ বছরের মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে দেওয়ারও আহ্বান জানান। ওই সরকারে পানিসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা নিজেও পাওয়ারচায়নার প্রকল্প নিয়ে বেশ উৎসাহ দেখান।
তবে প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির বিষয়ে অতি উৎসাহী হওয়ার কিছু অসুবিধাও ছিল। দ্বিতীয়ত, সীমিত মেয়াদসম্পন্ন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে তিস্তার মতো একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংগতিপূর্ণ ছিল না। তৃতীয়ত, পাওয়ারচায়নার ২০২৩ সালের সংশোধিত প্রকল্পের সমস্যাসমূহ আমরা এই সরকারের আমলেই তুলে ধরি। যে কারণেই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাওয়ারচায়নার প্রকল্প তেমন অগ্রসর হয়নি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি পাওয়ারচায়নার প্রকল্প নিয়ে বেশ উৎসাহ দেখায়। বিশেষত এই দলের রংপুর বিভাগের নেতারা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে তিস্তাপাড়ে বিরাট মশালমিছিল এবং ঢাকায় বিরাট মানববন্ধন করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের মতো এই সরকারও ভারতঘনিষ্ঠ নয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখায় যত্নবান। তবে এই সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নেও আগ্রহী। এই ত্রিমুখী টানাপোড়েনের মধ্যে সরকার তিস্তা সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে পানিসম্পদমন্ত্রী বিভিন্ন ফোরামে ঘোষণা করেছেন, সরকার দেশীয় পারদর্শিতার ভিত্তিতে তিস্তা সমস্যার সমাধান করতে চাইছে।
ঠিক কী কারণে বিএনপি সরকার দেশীয় পারদর্শিতার ওপর জোর দিচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। ওপরে উল্লিখিত ভূরাজনৈতিক ত্রিভুজ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। আরও লক্ষণীয়, সাধারণত বিদেশি কোম্পানি দ্বারা প্রণীত এবং বাস্তবায়িত প্রকল্পে দেশীয় বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা ‘জুনিয়র পার্টনার’–এর ভূমিকা পান এবং লাভবান হন।
কিন্তু পাওয়ারচায়নার প্রকল্পে এর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল না। কারণ, এই প্রকল্পে চীনারা ছিল একই সঙ্গে প্রকল্প প্রণয়নকারী ও বাস্তবায়নকারী। শোনা যায় যে এ কারণে পাউবো এবং বাংলাদেশের পানি মহলেও পাওয়ারচায়নার প্রকল্প নিয়ে কিছু অসন্তোষ ছিল। এই অসন্তোষ এ প্রকল্প সম্পর্কে সরকারের পরিবর্তিত মনোভাবের আরেকটি কারণ কি না, বলা কঠিন।
যা–ই হোক না কেন, সরকার যদি আন্তরিকভাবে দেশীয় সক্ষমতার ভিত্তিতে তিস্তা সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তবে সেটা খুশির কথা। তবে সফল হওয়ার জন্য এই প্রয়াসকে নদ–নদীবিষয়ক সঠিক দর্শনের ভিত্তিতে হতে হবে। এ বিষয়ে বিপরীতধর্মী ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
একটির অভিপ্রকাশ হলো গত ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি প্রকৌশল বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত সিম্পোজিয়াম, যেখানে পানিসম্পদমন্ত্রী ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই সিম্পোজিয়ামে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এবং অন্যান্য উপস্থাপনায় তিস্তার বিষয়ে বাপা, বেন ও তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের পক্ষ থেকে ওপরে উল্লিখিত বিকল্পে প্রস্তাবিত চিন্তাভাবনারই প্রতিধ্বনি শোনা যায়। এটা আশাব্যঞ্জক।
অন্যদিকে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বিকল্প তিস্তা প্রকল্পের ধারণাপত্র প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংকে (আইডব্লিউএম)। এই খবরে উৎসাহিত হওয়া কঠিন।
সরকার যদি আন্তরিকভাবে দেশীয় সক্ষমতার ভিত্তিতে তিস্তা সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তবে সেটা খুশির কথা। তবে সফল হওয়ার জন্য এই প্রয়াসকে নদ–নদীবিষয়ক সঠিক দর্শনের ভিত্তিতে হতে হবে। এ বিষয়ে বিপরীতধর্মী ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
প্রথমত, মূলত প্রকৌশলীদের নিয়ে গঠিত এই সংস্থা এখনো বহুলাংশে নদ–নদীর প্রতি বাণিজ্যিক পন্থা আঁকড়ে আছে, নদ–নদীর প্রাকৃতিক ভূমিকা সঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম করে না এবং নদ–নদীকে জৈবিক ও জীবন্ত সত্তা হিসেবে না দেখে মূলত একটি যান্ত্রিক বিষয় হিসেবে দেখে।
দ্বিতীয়ত, এই সংস্থা প্রণীত বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখায় যে সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ সমাধান খোঁজার পরিবর্তে নিয়োজনকারী সংস্থার পছন্দসই সুপারিশ প্রদানেই আগ্রহ বেশি। সুতরাং বাপা, বেন ও তিস্তা রক্ষা আন্দোলনের পক্ষ থেকে আমরা সরকারকে আহ্বান জানাব, গোপনীয়তার পরিবর্তে তিস্তার জন্য বিকল্প প্রকল্প প্রণয়নের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরিচালিত করতে। কাদেরকে নিয়ে ১১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠিত হয়েছে, তা প্রকাশ করুন। যেসব সংগঠন ২০–৩০ বছর ধরে তিস্তার সমস্যা সমাধানের জন্য সংগ্রাম করে আসছে, তাদের এ প্রক্রিয়ায় যথাযথ ভূমিকা দিন। যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ তিস্তা নিয়ে ভালো গবেষণা করছেন এবং তিস্তা রক্ষার সংগ্রামে অবদান রাখছেন, তাঁদের অংশগ্রহণ থেকেও উপকৃত হওয়ার উদ্যোগ নিন।
সুতরাং সন্দেহ নেই যে তিস্তা প্রকল্পকে ভূরাজনীতির ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে এবং তার উপায় হলো দেশীয় সক্ষমতার ভিত্তিতে এই প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। তবে কী ধরনের দেশীয় সক্ষমতার ওপর নির্ভর করা হবে, সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দুঃখজনক যে স্বাধীনতার পর পঞ্চাশের বেশি বছরে যে ধরনের জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ হবে বলে আশা করা গিয়েছিল, তা হয়নি।
কথা ছিল, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বাংলাদেশের পানিবিষয়ক একটা ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্সে’ পরিণত হবে। কিন্তু সময়ে এর সক্ষমতা যেন আরও হ্রাস পেয়েছে। যেকোনো চিন্তাশীল কাজের জন্য বাইরের পরামর্শক সংস্থার শরণাপন্ন হতে হয়।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দুর্নীতি। অন্য অনেক পানিবিষয়ক গবেষণা বা পরামর্শক সংস্থাসমূহও বহুলাংশে গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশের চিন্তাভাবনা আঁকড়ে আছে। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল বিগত সরকার কর্তৃক তথাকথিত ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ প্রণয়নের সময়। যখন খোদ নেদারল্যান্ডস পোল্ডার পন্থা থেকে সরে এসে ‘নদীর জন্য পরিসর’ খোঁজায় ব্যাপৃত হয়েছে, তখন তাঁরা বাংলাদেশে আরও পোল্ডার ও বাঁধ নির্মাণে উৎসাহী হয়েছিলেন। কাজেই জাতীয় সক্ষমতার ভিত্তিতে তিস্তা সমস্যা সমাধানের চিন্তা সঠিক। তবে সেই লক্ষ্যে কী ধরনের জাতীয় সক্ষমতার সন্ধান এবং ব্যবহার করতে হবে, তার প্রতিও মনোযোগ দিতে হবে।
লক্ষণীয়, কয়েকটি বিষয় জাতীয় সক্ষমতার ভিত্তিতে তিস্তা সমস্যার সমাধানকে সহজ করে।
প্রথমত, প্রযুক্তিগত সারল্য। জিও ব্যাগ দিয়ে তিস্তাপাড়ের স্থিতিশীলকরণ কোনো জটিল প্রযুক্তির দাবি করে না। এটা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়! ফলে প্রযুক্তির জন্য বিদেশের দ্বারস্থ হতে হবে না।
দ্বিতীয়ত, এই প্রযুক্তিগত সারল্য জনগণকে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে (এমনকি স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে) শামিল হওয়ার সুযোগের সৃষ্টি করে। নদী রক্ষা একটা দেশপ্রেমিক মহাযজ্ঞে পরিণত হতে পারে।
তৃতীয়ত, ব্যয়স্বল্পতা। অত্যন্ত সামান্য বাজেট দিয়েই এ কাজ সম্পন্ন হতে পারে। ফলে ঋণের জন্যও বিদেশের দ্বারস্থ হতে হবে না। যাঁরা প্রকল্পকে কেবল অর্থ উপার্জনের উপায় হিসেবে দেখেন, তাঁরা এতে হতাশ হতে পারেন। তবে জনগণ আরও ঋণের ভার গ্রহণ থেকে মুক্তি পাবেন। বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এই পথে অগ্রসর হবে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
● নজরুল ইসলাম অধ্যাপক এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান
* মতামত লেখকের নিজস্ব