ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা রজনীকান্ত। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের প্রিয় এই তারকা আজ সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে থাকলেও, তাঁর হৃদয়ে গেঁথে আছে সাধারণ জীবনের স্মৃতি। তারকা ইমেজের চেয়ে তিনি নিজেকে একজন বাস কন্ডাক্টরের পরিচয়েই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন।

আজ ১৫ অক্টোবর মুক্তি পেয়েছে রজনীকান্ত অভিনীত বহুল প্রতীক্ষিত তামিল সিনেমা ‘জেলার ২’। এই ছবির প্রচারণার অংশ হিসেবে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে নিজের অতীতের কথা স্মরণ করেন তিনি। জীবনের সেই অধ্যায়ে ফিরে গিয়ে রজনীকান্ত জানান, যখন অভিনয় তাঁর পেশা ছিল না, বরং বাসের টিকিট কাটাই ছিল তাঁর জীবিকা। টানা পাঁচ বছর বাস কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। সেই দিনগুলোর কথা তিনি আজও ভুলেননি। বরং তাঁর মতে, অভিনয়কে ভালোবাসলেও কন্ডাক্টরের কাজের প্রতি তাঁর টান আরও গভীর। সুপারস্টার পরিচয়ের আড়ালেও তিনি নিজেকে সেই বাস কন্ডাক্টর হিসেবেই ভাবতে পছন্দ করেন।

রজনীকান্তের আসল নাম শিবাজি রাও গায়কোয়াড়। ১৯৫০ সালের ১২ ডিসেম্বর বেঙ্গালুরুতে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতার শৈশব কেটেছে এক সাধারণ পরিবারের নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। সিনেমার জগতে প্রবেশের আগে জীবনধারণের জন্য তিনি বিচিত্র সব কাজ করেছেন। কখনো অফিস বয়, কুলি, কাঠমিস্ত্রি এবং কখনো বা বাস কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। বেঙ্গালুরুর বাস পরিবহনব্যবস্থায় পাঁচ বছর কাজ করার সময় যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলা, টিকিট দেওয়া আর খুচরা ফেরানোর ভঙ্গি তাঁর এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, যাত্রীরা বিশেষ করে তাঁর বাসের জন্যই অপেক্ষা করতেন।

তাঁর শিক্ষাজীবনের কথা বলতে গেলে জানা যায়, গাভিপুরম গভর্নমেন্ট কন্নড় মডেল প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা করেছেন রজনীকান্ত। পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি দুষ্টুমিতেও ছিলেন পটু তিনি। ক্রিকেট ও ফুটবলের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। পরবর্তীতে ভাইয়ের সহায়তায় তিনি ভর্তি হন রামকৃষ্ণ মিশনে। সেখানেই আধ্যাত্মচর্চার প্রতি তাঁর অনুরাগ তৈরি হয় এবং অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ জাগে। মঞ্চনাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রশংসা অর্জন করেন।

জীবনের নানা লড়াইয়ের মাঝেও অভিনয়ের স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি। পরিবারের প্রাথমিক আপত্তি থাকলেও বন্ধুর সহায়তায় মাদ্রাজ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন তিনি। মজার ব্যাপার হলো, অল্প কিছু তামিল শব্দ জেনেই তিনি সেখানে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানেই পরিচালক কে বালাচন্দর তাঁকে নতুন নাম দেন—রজনীকান্ত; যার অর্থ রাতের রং।

‘জেলার ২’-এর প্রচার অনুষ্ঠানে পরিচালক নেলসন দিলীপকুমারের সঙ্গে আলাপচারিতায় রজনীকান্ত জানান, বাস কন্ডাক্টরের কাজের সঙ্গে তাঁর এক গভীর আবেগের সম্পর্ক রয়েছে। বাস কিংবা খাকি পোশাক পরা কন্ডাক্টরদের দেখলে তাঁর পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে। এমনকি বেঙ্গালুরুতে যাওয়ার পেছনেও এই স্মৃতির বড় ভূমিকা রয়েছে।

রজনীকান্ত বলেন, ‘সত্যি বলতে, রজনীকান্ত বা সুপারস্টার—এই পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে আমার কিছুটা অসুবিধা হয়। এ কারণেই আমি বারবার বেঙ্গালুরুতে যাই। বাস দেখলেই ভালো লাগে। কিছুদিন আগেও বেঙ্গালুরুতে গিয়েছিলাম। কন্ডাক্টরের সেই খাকি পোশাক দেখলে এখনো পুরোনো দিনের জন্য মন কেমন করে। আমি নিজেকে একজন বাস কন্ডাক্টর হিসেবেই ভাবি।’

রজনীকান্তের এই নতুন সিনেমা ‘জেলার ২’ মূলত ২০২৩ সালের ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘জেলার’-এর সিক্যুয়েল। আগের সিনেমার মতোই এবারও পরিচালনায় আছেন নেলসন দিলীপকুমার এবং সংগীতে অনিরুদ্ধ রবিচন্দর। প্রথম সিনেমায় রজনীকান্ত অভিনয় করেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত কারা কর্মকর্তা মুথুভেল পান্ডিয়ান চরিত্রে, যিনি ‘টাইগার’ নামে পরিচিত ছিলেন। পরিবারের ওপর বিপদ নেমে এলে পুরোনো অপরাধজগতের যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিলেন।

দ্বিতীয় পর্বেও সেই একই চরিত্রে ফিরছেন রজনীকান্ত। নতুন করে অপরাধজগতের হুমকি তৈরি হলে পরিবার ও নিজের উত্তরাধিকার রক্ষায় তাঁকে আবারও কঠোর হতে হবে। সিনেমার ট্রেলার দেখে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, এবার শত্রুর পরিধি আরও বড় এবং বিপদও অনেক বেশি। তবে গল্পের সব খুঁটিনাটি এখনো গোপন রাখা হয়েছে।

সিনেমাটিতে রজনীকান্ত ছাড়াও অভিনয় করেছেন বিদ্যা বালান, এস জে সূর্য, মোহনলাল, শিবরাজকুমার, মিঠুন চক্রবর্তী, সুরাজ ভেঞ্জারামুডু, রম্যা কৃষ্ণন, যোগী বাবু এবং জ্যাকি শ্রফসহ আরও অনেকে।