মুন্সীগঞ্জের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং জাতীয় সংসদের সাবেক প্যানেল স্পিকার আবদুল হাই আর নেই। বুধবার (১৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত পপুলার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৭ বছর বয়সী এই নেতা ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর খবরটি পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন।

বর্ষীয়ান এই নেতার প্রয়াণে মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। বিশেষ করে বিএনপির কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়।

পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর মুন্সীগঞ্জে দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন করে তাঁকে দাফন করা হবে।

১৯৪৯ সালের ৫ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার হোসেন্দী গ্রামে আবদুল হাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মনির উদ্দিন ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। পারিবারিক জীবনে তিনি স্ত্রী জামিলা খাতুন, দুই পুত্র ও দুই কন্যা। তাঁর বড় ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষাজীবনের কথা বললে, আবদুল হাই মুন্সীগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং মুন্সীগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

বিএনপির সাথে যুক্ত হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন আবদুল হাই। তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কোষাধ্যক্ষসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে তাঁর ব্যক্তিগত নৈতিকতা, সাদামাটা জীবনযাপন এবং সহজ বাচনভঙ্গির কারণে স্থানীয় পর্যায়ে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি অর্জন করেছিলেন।

১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তাঁর সংসদীয় রাজনীতির যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, একই বছরের ১২ জুন এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সব মিলিয়ে পাঁচবার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আবদুল হাই। তাঁর রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি বিভিন্ন সময়ে ঢাকা-৮ ও মুন্সীগঞ্জ-৪ আসনের রাজনীতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।

১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করার পর আবদুল হাই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদের প্যানেল স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। সংসদ সদস্য ও উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন।

তাঁর মৃত্যুতে মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতার দীর্ঘ পথচলার অবসান ঘটল। তাঁর প্রয়াণে রাজনৈতিক সহকর্মী, দলীয় নেতাকর্মী, অনুসারী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সাধারণ এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে।