প্রোফাইলের ছবিতে দেখা যাচ্ছে সেনাবাহিনীর এক নারী সদস্যকে। পরনে সামরিক পোশাক, আর কথাবার্তাও একদম নারীর মতোই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই পরিচয় ব্যবহার করেই এক ইতালিপ্রবাসী তরুণের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছিল। তবে বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন; ওই ‘নারী সেনাসদস্য’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিটি আসলে ছিলেন একজন যুবক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ব্যবহার করে তৈরি করা ভুয়া ছবি ও পরিচয় দিয়ে ওই তরুণের কাছ থেকে প্রায় সাত লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে তোফায়েল আলম টিটু নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে সাইবার অপরাধের ধরন কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠছে, তার একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত। বর্তমানে নকল মুখ, কৃত্রিম কণ্ঠস্বর এবং ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে প্রেমের ফাঁদ পাতা, আর্থিক প্রতারণা, ব্ল্যাকমেল এবং সেক্সটরশনের মতো অপরাধের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দৈনন্দিন প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এই নকল কনটেন্টগুলো এখন এতটাই বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল এবং নকলের পার্থক্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি দৈনিক সমকালের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এআই ও ডিপফেকনির্ভর সাইবার অপরাধ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থার ‘এশিয়া অ্যান্ড সাউথ প্যাসিফিক সাইবারথ্রেট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট’-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাইবার অপরাধীদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ফোরাম ও টেলিগ্রাম চ্যানেলে ডিপফেক সংক্রান্ত আলোচনা গত এক বছরে ৬০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরাধীরা এখন ফিশিং বার্তা, ভুয়া পরিচয় এবং ডিপফেক কনটেন্ট তৈরিতে ব্যাপকভাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ইন্টারপোলের অন্য একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এআই-সহায়িত প্রতারণা চার গুণ বা তার চেয়েও বেশি লাভজনক, যার ফলে রোমান্স স্ক্যাম এবং সেক্সটরশনে এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ছে।

বাংলাদেশেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই অপব্যবহারের প্রভাব স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের মধুপুরে সাবেক স্ত্রীর বিকৃত ছবি এআই দিয়ে তৈরি করে ১০ লাখ টাকা দাবি করার অভিযোগে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে, ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারীর ছবি ও কণ্ঠ নকল করে এআই ও ডিপফেক ভিডিওর মাধ্যমে যৌন উত্তেজক ওষুধের ভুয়া বিজ্ঞাপন প্রচারের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। এছাড়া, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিআরটিএ-এর একটি ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে ট্রাফিক জরিমানার নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছিল সিআইডি।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অভিযানের পাশাপাশি দেশীয় পর্যায়ে সক্রিয় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের বিশেষায়িত যৌথ অভিযানের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে অনেক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, ডিএমপি এবং সিআইডিসহ বিভিন্ন ইউনিট সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করছে। সম্প্রতি অপরাধ দমনে একটি স্বতন্ত্র ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠন করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “দেশে প্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহারের প্রবণতা বাড়লেও তা দমনে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রযুক্তিগত দক্ষতা অনেক সময় অপরাধীদের চেয়ে পিছিয়ে থাকছে। আইনের সঠিক প্রয়োগের পাশাপাশি সাইবার সুরক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও নেটওয়ার্কিং জরুরি।”

প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রতারণার কৌশলগুলোও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে ডিজিটাল পর্দার ওপাশে থাকা মানুষটি প্রকৃতপক্ষে কে—এই সাধারণ প্রশ্নটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।