এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হন। এদের মধ্যে একটি বড় অংশই এমন শিক্ষার্থী, যারা মাত্র এক বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষার্থী সব বিষয়েই ভালো নম্বর পেয়েছেন, কিন্তু কোনো বিশেষ কারণে একটি বিষয়ে পরীক্ষা খারাপ হওয়ায় পুরো একটি বছর নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের গতি বাধাগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষাবিদদের দাবি ছিল যে, ফলাফল প্রকাশের পর এবং নতুন শিক্ষাবর্ষের কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই অকৃতকার্য বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হোক।
ভারত ও পাকিস্তানের মতো বিভিন্ন দেশে পাবলিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূরক পরীক্ষার ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ব্যবস্থাটি তুলনামূলকভাবে দেরিতে চালু হচ্ছে। তবে সম্প্রতি এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার যে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিনের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, সরকার এই বিষয়ে একটি নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করেছে।
মুক্তকণ্ঠের খবর জানাচ্ছে, বোর্ডগুলো তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে এবং এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় মতামত প্রদান করা হয়েছে। বোর্ডগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, চলতি বছরেই এইচএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব। আমরা আশা করি, এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যমেই এই নতুন ব্যবস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হবে।
উল্লেখ্য যে, এবারের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা মিলিয়ে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। সব মিলিয়ে ৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এ বছর অকৃতকার্য হয়েছেন, যা যেকোনো বিবেচনায় একটি বিশাল সংখ্যা। বর্তমান নিয়মে এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে শিক্ষার্থীদের পরবর্তী বছরে হয় শুধু অকৃতকার্য বিষয়ে অথবা সব বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সহজ হবে। পাশাপাশি প্রতি বছর নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য আলাদা পরীক্ষা আয়োজন এবং প্রশ্নপত্র তৈরির যে জটিলতা রয়েছে, তারও অবসান ঘটতে পারে।
তবে আমরা মনে করি, এই নতুন ব্যবস্থাটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর আগে অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। বিশেষ করে পরীক্ষার নিয়মাবলি, মূল্যায়নের পদ্ধতি, ফলাফল প্রকাশের নির্দিষ্ট সময়সীমা, সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে এই পরীক্ষার গ্রহণযোগ্যতা—এই বিষয়গুলোর যথাযথ মীমাংসা প্রয়োজন। সঠিক নীতিমালা ছাড়া কোনো ব্যবস্থা চালু করলে ভবিষ্যতে নতুন ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। এছাড়া, যারা পরীক্ষা দিয়েও উত্তীর্ণ হতে পারবেন না, তাদের কারিগরি শিক্ষায় স্থানান্তর করার যে মন্তব্য করা হয়েছে, তা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। এই ক্ষেত্রে কোনো কিছু বাধ্যতামূলকভাবে চাপিয়ে না দিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মতির বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
পাবলিক পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেওয়া নয়, বরং তাদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার সঠিক মূল্যায়ন করা। একটি বা দুটি বিষয়ে ব্যর্থতার কারণে যেন কোনো শিক্ষার্থীর জীবন থেকে একটি মূল্যবান বছর হারিয়ে না যায়। বিশ্বের অনেক উন্নত শিক্ষাব্যবস্থায় পুনঃপরীক্ষা বা দ্বিতীয় সুযোগের ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকেও এখন আরও শিক্ষার্থীবান্ধব এবং বাস্তবসম্মত করে গড়ে তুলতে হবে।