আজ ১৫ অক্টোবর। বিশিষ্ট কবি হাসান হাফিজের বয়স আজ ৭১ বছর পূর্ণ হলো। মানুষ হিসেবে তিনি কেমন? কবি হাসান হাফিজ যে মানুষটি—অসামান্য সরল এবং অজটিল। তাঁর সঙ্গে আমার সখ্যতা ছাত্রজীবন থেকেই। হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠতা সেই সখ্যতাকে আরও গভীর ও গাঢ় করেছে। হুমায়ূন আহমেদের অত্যন্ত পছন্দের মানুষদের একজন ছিলেন হাসান ভাই। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর প্রেমের উপন্যাস (প্রচ্ছদে লেখা ছিল) ‘তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে’ উৎসর্গ করেছিলেন হাসান ভাই এবং তাঁর সহধর্মিণীকে:
“হাসান হাফিজ
শাহীন আখতার
যুগলেষু”
হুমায়ূন আহমেদের আরেকটি বইয়ের ভূমিকায় হাসান ভাইয়ের কথা অত্যন্ত চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। সেই ভূমিকাটি হুবহু তুলে ধরছি:
“লেখকের কাছ থেকে লেখা আদায়ের অনেক রকম পদ্ধতি আছে। সবচে নিম্ন শ্রেণীর পদ্ধতিটি হল—গলায় গামছা বেঁধে লেখা আদায় করা। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে আমার কবি-বন্ধু হাসান হাফিজ ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’র লেখাগুলি আমাকে দিয়ে লিখিয়েছেন। মাঝে মাঝে এমনও হয়েছে আমি ক্ষিপ্ত হয়ে ভেবেছি, বড় একটা ডান্ডা দিয়ে হাসান হাফিজের মাথায় শক্ত বাড়ি দিই। তারপর থানা–পুলিশ যা হবার হবে।
বই আকারে বের করার আগে লেখাগুলি পড়তে গিয়ে ভাল লাগল। মনে হল হাসান হাফিজকে সাময়িকভাবে ক্ষমা করা যায়। আমি এর আগে কোন একটি বই-এ লিখেছিলাম—আত্মকথা–জাতীয় লেখা আর লিখব না। এই বইটিতে কিছু সেরকম রচনা ঢুকে গেছে। পাঠক-পাঠিকারা আমার সে কথা না রাখার অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন—এই প্রার্থনা। বলতে ভুলে গেছি এই গ্রন্থের বেশির ভাগ লেখাই আমার প্রিয় পত্রিকা দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয়েছে।”
হুমায়ূন আহমেদ
১২.১২.৯৪
সমুদ্রবিলাস
সেন্ট মার্টিন আইল্যান্ড
সেই ১৯৯৪ সাল। হুমায়ূন আহমেদ তখন তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয় লেখক। কোনো পত্রিকায় ধারাবাহিক রচনা লেখা তাঁর জন্য এবং পত্রিকার জন্য বেশ ঝামেলাপূর্ণ বিষয় ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি ‘দৈনিক বাংলায়’ প্রায় নিয়মিত লিখেছিলেন ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’। সেটি কীভাবে সম্ভব হয়েছিল, তার উত্তর পাওয়া যায় বইয়ের ভূমিকায়। বড় লেখক এবং বড় শিল্পী যেমন দুই-তিন টানে একটি পোর্ট্রেট ড্রয়িং করতে পারেন, বড় লেখক তেমন দুই-তিন লাইনে একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলতে পারেন। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর কবি-বন্ধু হাসান হাফিজকে নিয়ে যা লিখেছেন, তা তাঁদের অন্তরঙ্গতারই বহিঃপ্রকাশ। গলায় গামছা বেঁধে লেখা আদায়ের কথাটি ছিল মূলত কথার কথা; তবে হুমায়ূন আহমেদের কাছ থেকে লেখা আদায় করার কলাকৌশল হাসান ভাই খুব ভালো জানতেন। সহজ কৌশল আর সরল অন্তরঙ্গতাই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। হাসান ভাই খুব সহজেই মানুষের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে পারেন, তাঁর মধ্যে কোনো ঘোরপ্যাঁচ নেই।
হাসান হাফিজ সত্তর দশকের একজন কবি এবং অত্যন্ত বহুপ্রজ কোবিদ। তিনি কবিতা, গদ্য, শিশুসাহিত্য এবং সাংবাদিকতা—সবকিছুই সমান দক্ষতায় পরিচালনা করেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক। এর মধ্যে রয়েছে গবেষণা গ্রন্থ, সাক্ষাৎকার গ্রন্থ, রঙ্গব্যঙ্গ, ফিচার গ্রন্থ, বিজ্ঞানবিষয়ক এবং শিশুতোষ রচনার এক বিশাল সম্ভার। কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ষাটের বেশি, যার মধ্যে দুটি দ্বিভাষিক (বাংলা ও ইংরেজি)। বিভিন্ন সময়ে তাঁর কবিতা ইংরেজি, ফরাসি, চীনা, স্প্যানিশ, জার্মান, জাপানি, হিন্দি, উর্দু, আরবি, ফারসি ও চাকমা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং অসংখ্য পদক ও সম্মাননা লাভ করেছেন। শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ২০২৫ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। স্বভাবগতভাবে তিনি উচ্চকিত নন, বরং একজন অত্যন্ত পরিশ্রমী সাহিত্যিক।
১৯৫৫ সালের ১৫ অক্টোবর সোনারগাঁওয়ের এলাহিনগরে তাঁর জন্ম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় মাস্টার্স করেছেন। এর আগে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন, অর্থাৎ তিনি একজন ডাবল এমএ ডিগ্রিধারী। তাঁর জীবন যথেষ্ট সাফল্যমণ্ডিত।
হাসান ভাইয়ের ষাটের অধিক কবিতার বইয়ের অধিকাংশের প্রচ্ছদ আমিই করেছি। অধিকাংশ বইয়ের নামকরণের পেছনে আমার একটি প্রচ্ছন্ন ভূমিকা রয়েছে। হাসান ভাই সাধারণত দুই-তিনটি নাম প্রস্তাব করেন এবং আমি ভোট দিয়ে একটি চূড়ান্ত করি। দীর্ঘ বছর ধরে আমাদের সম্পর্ক এভাবেই চলছে। হাসান ভাই আমাকে একটি বিশেষ নামে ডাকেন, তবে সেটি এখানে প্রকাশ করছি না। ভালোবাসা, মায়া ও মমতার সব গুমর সবখানে ফাঁস না করাই শ্রেয়।
এর ভালো হোক
ওর ভালো হোক
যে ভাবে সে
সেই ভালো লোক!
হাসান ভাই সেই ভালো মানুষটি। শুভ জন্মদিন, হাসান ভাই। শুভ জন্মদিন, কবি হাসান হাফিজ। উল্লেখ্য, ‘এক জন্ম এভাবেই’ হাসান হাফিজের একটি কাব্যগ্রন্থের নাম।