মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক সবসময় একরকম থাকে না; অনেক সময় তা ভেঙে যেতে পারে। একসঙ্গে জীবন কাটানোর ইচ্ছা বদলে যাওয়া কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। বরং বিভিন্ন বৈপরীত্য, জটিলতা এবং বাস্তব পরিস্থিতির কারণে এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ঘটনা। সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈবাহিক সম্পর্কের ইতি যদি আইনগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সহজ এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে, তবেই তা সমীচীন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আইনের দৃষ্টিতে যদি বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটানোর কোনো সুযোগ না থাকে, তবে দম্পতিরা কী করবেন?

পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আইনি ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলেও কিছু ব্যতিক্রমী দেশ রয়েছে। ফিলিপাইন এবং ভ্যাটিকান সিটি এমন দুটি রাষ্ট্র, যেখানে সাধারণ বিবাহবিচ্ছেদের কোনো আইনি সুযোগ নেই। তবে দাম্পত্য জীবনে চরম সংকট তৈরি হলে এই দুই দেশের স্বামী-স্ত্রীর সামনে কিছু নির্দিষ্ট আইনি ও ধর্মীয় বিকল্প পথ খোলা থাকে।

ফিলিপাইনের কথা ধরা যাক। সেখানে অধিকাংশ বিবাহিত দম্পতির জন্য প্রচলিত বিবাহবিচ্ছেদের সাধারণ কোনো আইন নেই। তবে আইনি বিচ্ছেদ (আইনগতভাবে আলাদা থাকা), বিয়ে বাতিল এবং বিয়েকে শুরু থেকেই অবৈধ ঘোষণার মতো কিছু ব্যবস্থা সেখানে চালু আছে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, আইনি বিচ্ছেদ মানেই বিবাহবিচ্ছেদ নয়। আদালত স্বামী-স্ত্রীকে আলাদা থাকার অনুমতি দিলেও তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্কটি কাগজে-কলমে বহাল থাকে। এর ফলে তাঁরা সাধারণত নতুন করে বিয়ে করতে পারেন না।

নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতি যেমন—শারীরিক নির্যাতন, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক কিংবা সঙ্গীকে পরিত্যাগ করার মতো ঘটনায় আইনি বিচ্ছেদের আবেদন করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে, বিয়ে বাতিল বা অবৈধ ঘোষণার ক্ষেত্রে আদালত খতিয়ে দেখেন যে, বিয়েটি আইনগতভাবে বৈধ ছিল কি না।

তবে ফিলিপাইনে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক পারিবারিক আইন বিদ্যমান। নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষ এই আইনের আওতায় থাকা দম্পতিরা তালাক, খুলা কিংবা আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের সুযোগ পান। এছাড়া বিদেশে সম্পন্ন হওয়া কিছু বিবাহবিচ্ছেদ নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে ওই দেশে স্বীকৃতি পেতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে একবার বিয়ের পর বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রথম সম্পর্ক থেকে আইনগতভাবে বেরিয়ে নতুন করে বিয়ে করে থিতু হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই কারণে অনেকে দেশ পরিবর্তন করে অন্য দেশে চলে যান এবং সেখানকার আইনের অধীনে পছন্দের মানুষকে বিয়ে করে নতুন করে সংসার শুরু করেন। তবে খুব অল্প সংখ্যক মানুষই এই সুযোগ পান।

অন্যদিকে, ভ্যাটিকান সিটিতে বিয়েকে ধরা হয় এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন হিসেবে। ক্যাথলিক চার্চের ধর্মীয় আইন অনুযায়ী, যে বিয়ে বৈধ এবং পরিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তাকে সাধারণভাবে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। এই দৃঢ় বিশ্বাসের কারণেই সেখানে প্রচলিত বিবাহবিচ্ছেদের কোনো ব্যবস্থা নেই।

তবে এখানেও নির্দিষ্ট শর্তে কোনো বিয়েকে অবৈধ ঘোষণা করার সুযোগ রয়েছে। এর অর্থ হলো, বিয়েটি শুরু থেকেই ধর্মীয় আইনের সব শর্ত পূরণ করেছিল কি না, তা যাচাই করা। কেবল সম্পর্ক ভেঙে গেছে বলে কোনো বিয়ে অবৈধ হয়ে যায় না। এছাড়া বিশেষ পরিস্থিতিতে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকতে পারেন, কিন্তু আলাদা থাকা মানেই বৈবাহিক বন্ধনের অবসান নয়। ফলে দ্বিতীয় বিয়ের সুযোগ সেখানে নেই বললেই চলে। এমন ক্ষেত্রে অনেকে অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে সেই দেশের আইনে প্রথম বিয়েটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং এরপর আইনগতভাবে দ্বিতীয় বিয়ের দিকে আগান। তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং জটিল।