ফ্রান্সের শত শত সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ও হিমাগার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় এক ভয়াবহ সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত ১৩ অক্টোবর সংঘটিত এই হামলায় হ্যাকাররা কোল্ড স্টোরেজ নিয়ন্ত্রণকারী সফটওয়্যারে প্রবেশ করে ফ্রিজারের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে রাতারাতি নষ্ট হয়ে যায় বিপুল পরিমাণ তাজা ও হিমায়িত খাবার। কোনো কোনো দোকানে তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে তা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায় এবং ফ্রিজার থেকে গরম বাতাস বের হতে শুরু করে। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।
তদন্তে জানা গেছে, এই সাইবার হামলাটি চালানো হয়েছিল ডেনমার্কের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ড্যানফসের তৈরি একটি সফটওয়্যার সিস্টেমের ওপর, যা সাত শতাধিক সুপারমার্কেটে ব্যবহৃত হয়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমেই মূলত সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। হ্যাকাররা দূর থেকেই এই সিস্টেমের সেটিংস বদলে দেয়। সাধারণত ফ্রিজে বাড়তি বরফ জমা রোধ করতে অল্প সময়ের জন্য ডিফ্রস্টিং বা বরফ গলানোর প্রক্রিয়া চলে। কিন্তু হ্যাকাররা সেই প্রক্রিয়াটিকে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক দীর্ঘ করে দেয়। এর ফলে ফ্রিজগুলো ঠান্ডা হওয়ার পরিবর্তে একটানা গরম হতে থাকে এবং তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো উচ্চমাত্রায় পৌঁছে যায়, যা হিমায়িত খাবারগুলোকে নষ্ট করে দেয়।
ফ্রান্সের বিভিন্ন খাদ্যপণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের তথ্যানুযায়ী, দেশটির কয়েক শ সুপারমার্কেট এই হামলার শিকার হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বড় চেইন শপগুলোর মধ্যে রয়েছে ইন্টারমার্শে, নেত্তো, কুপারেটিভ ইউ, ক্যারফুর ও মনোপ্রিক্স। আইসক্রিম রাখার ফ্রিজে ২৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা দেখানোর ছবিও সামনে এসেছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা আরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
খাবার নিরাপদ রাখার জন্য প্রয়োজনীয় শীতল পরিবেশ বা যাকে ‘কোল্ড চেইন’ বলা হয়, তা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হয়। এই অবস্থায় খাবার খেলে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে, তাই ক্ষতিগ্রস্ত অনেক দোকান কর্তৃপক্ষ তাদের তাজা ও হিমায়িত খাবার ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছে।
ডেনমার্কের ফ্রিজিং সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ড্যানফস জানিয়েছে, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিল পুরোনো মডেলের, যেগুলোতে সফটওয়্যার ও নিরাপত্তার হালনাগাদ বা আপডেট দেওয়া হতো না। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই গ্রাহকদের সফটওয়্যার হালনাগাদ রাখার এবং পুরোনো ব্যবস্থার বদলে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে আসছিল। বর্তমানে হ্যাকাররা ঠিক কোন দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এই নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত যন্ত্রপাতির নিরাপত্তায় সামান্য ত্রুটিও যে বড় বিপদের কারণ হতে পারে, এই ঘটনা তারই এক প্রকট উদাহরণ।
ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোল্যান্ড লেস্কিউর গত ১৩ অক্টোবর পার্লামেন্টে জানান, দেশটির মোট ১০ হাজার সুপারমার্কেটের মধ্যে প্রায় ৭০০টি এই ঘটনার কবলে পড়েছে। যদিও তিনি জানান যে এতে জনগণের খাদ্য সরবরাহে বড় কোনো ঝুঁকি সৃষ্টি হয়নি, তবে তিনি স্বীকার করেন, “এই সাইবার হামলা খাদ্যনিরাপত্তার মূল ভিত্তিকে আঘাত করেছে।” তিনি আরও বলেন, “ঘটনাটি সবার জন্যই একটি বড় সতর্কবার্তা।”
বিভিন্ন সুপারমার্কেট চেইনের তথ্যমতে, ইন্টারমার্শে ও নেত্তোর প্রায় ৩০০টি দোকান এবং কুপারেটিভ ইউর ২ হাজার দোকানের মধ্যে অন্তত ৮০টি দোকান এই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ক্যারফুর ও মনোপ্রিক্সের কিছু দোকানেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের সঠিক সংখ্যা এবং আর্থিক ক্ষতির মোট পরিমাণ এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
কুপারেটিভ ইউয়ের প্রধান ডমিনিক শেলচার জানান, কিছু দোকানে দ্রুত কারিগরি সহায়তা পৌঁছানোয় খাবার নষ্ট হওয়া ঠেকানো গেছে। তবে যেসব দোকানে তাপমাত্রা অনেক বেড়ে গিয়েছিল, সেখানে বিপুল পরিমাণ খাবার ফেলে দিতে হয়েছে। ১৩ অক্টোবর এক সাক্ষাৎকারে শেলচার বলেন, “এ হামলা ছিল অপ্রত্যাশিত ও অত্যন্ত গুরুতর।” ইউরোপের বড় বাণিজ্যিক রেডিও নেটওয়ার্ক আরটিএলকে তিনি বলেন, “হামলাকারীরা সাধারণ মানুষের খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপর আঘাত হেনেছে।” তিনি আরও জানান, তার দীর্ঘ পেশাগত জীবনে তিনি এমন ঘটনা আগে দেখেননি।
ক্ষতির সুনির্দিষ্ট হিসাব না দিলেও শেলচার জানান, ফ্রিজিং ব্যবস্থা অচল হয়ে গেলে একটি ছোট সুপারমার্কেটের কয়েক হাজার ইউরো ক্ষতি হতে পারে এবং বড় হাইপারমার্কেটের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির পরিমাণ দুই লাখ ইউরোর বেশি হতে পারে। উত্তর ফ্রান্সের একটি ছোট শহরের সুপারমার্কেট ব্যবস্থাপক জুলিয়েন ফ্রেরেট জানান, তাঁদের দোকানের সব তাজা ও হিমায়িত খাবার নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, গ্রামীণ এলাকায় এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তা তাঁরা কল্পনাও করেননি। সব পণ্য ফেলে দিতে হওয়ায় সেদিন ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করার মতো কিছুই ছিল না।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই হামলার দায় এখন পর্যন্ত কেউ স্বীকার করেনি এবং হামলাকারীদের কাছ থেকে কোনো মুক্তিপণও দাবি করা হয়নি। সাধারণত সাইবার অপরাধীরা অর্থ আদায়ের জন্য মুক্তিপণ দাবি করে অথবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হামলা চালালে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী দায় স্বীকার করে। এই ঘটনায় তেমন কিছু না ঘটায় হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বর্তমানে প্যারিসের পাবলিক প্রসিকিউটর কার্যালয়ের সাইবার অপরাধ দমন বিভাগ বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্তের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শনাক্ত করা, খাবার নষ্ট হওয়ার সঙ্গে সাইবার হামলার যোগসূত্র খুঁজে বের করা এবং অগ্নিকাণ্ডের কারণ নির্ধারণ করা। ড্যানফস জানিয়েছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়তা করছে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করেছে যে, দৈনন্দিন ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তা সাইবার হামলার লক্ষ্য হতে পারে। তাই সফটওয়্যার হালনাগাদ রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন শুধু প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের নয়, বরং খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।