জামায়াতে ইসলামীর কুমিল্লা মহানগর কমিটির নতুন নেতৃত্ব গঠনকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ও সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। দলটির মহানগর কার্যালয় চত্বরে ককটেল বিস্ফোরণ এবং গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই বিশৃঙ্খলার সময় মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমানের ব্যক্তিগত গাড়িটি লক্ষ্য করে ভাঙচুর চালানো হয়। আজ বুধবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে কুমিল্লার মোগলটুলি এলাকার ফারুকিয়া হাউজিংয়ে অবস্থিত দলটির মহানগর কার্যালয়ে এই অপ্রীতিকর ঘটনাটি ঘটে।
ঘটনার সময় দলীয় কার্যালয়ের ভেতরে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাছুমসহ মহানগরের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা মহানগর জামায়াতের আমির নির্বাচনপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা ও রুকনদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই কার্যালয়ের বাইরে একদল নেতা-কর্মী জড়ো হয়ে তীব্র হট্টগোল শুরু করেন। উত্তেজনার এক পর্যায়ে কার্যালয় চত্বরে ককটেল বিস্ফোরণ করা হয় এবং সেখানে রাখা মাহবুবুর রহমানের গাড়িটি ভাঙচুর করা হয়।
জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে এই অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ, গাড়ি ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের খবর পেয়ে দ্রুত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। বর্তমানে সেখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে রাত সাড়ে আটটার দিকে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে নিজেদের সংঘর্ষ, গাড়ি ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই ঘটনার বিষয়ে মহানগর জামায়াতের অন্তত তিনজন নেতার সঙ্গে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। তাঁরা কমিটি গঠন নিয়ে বিদ্যমান বিরোধ, ককটেল বিস্ফোরণ এবং গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাটি স্বীকার করেছেন। তবে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে চেয়েছেন তাঁরা এবং নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
ওই তিন নেতার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কাজী দ্বীন মোহাম্মদ দীর্ঘ সময় ধরে মহানগরের আমির পদে আসীন থাকায় দলের একটি অংশের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে মহানগর কমিটির বর্তমান মেয়াদের সমাপ্তি ঘটবে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, বর্তমান আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, নায়েবে আমির এ কে এম এমদাদুল হক (মামুন) ও আরেক নায়েবে আমির মোসলেহ উদ্দিনকে পরবর্তী কমিটির নেতৃত্বে রাখা হবে না। তাঁদের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে অন্য কোনো দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
ওই তিন নেতার ভাষ্যমতে, সম্প্রতি আমির নির্বাচন উপলক্ষে যে ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, সেখানে বর্তমান আমির ও দুই নায়েবে আমিরের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে বর্তমান সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতাদের নাম তালিকায় রয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে দলের একাংশের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মাহবুবুর রহমান আমির নির্বাচিত হতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে গত কয়েক দিন ধরে তাঁর বিরুদ্ধে জমি কেনাবেচাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয় এবং বিভিন্ন নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়।
জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, রুকনদের ভোটে দলের আমির নির্বাচিত হন। কুমিল্লা মহানগর কমিটির আমির নির্বাচনপ্রক্রিয়ার দায়িত্ব পালন করছেন কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাছুম। আজ তিনি মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে একটি বৈঠকের আয়োজন করেন। বৈঠক চলাকালীন এ কে এম এমদাদুল হকের অনুসারীরা কার্যালয়ের বাইরে হট্টগোল শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়ি ভাঙচুরের রূপ নেয়।
ঘটনার পর কার্যালয়ের সামনে ভাঙা গাড়ির কাচের টুকরো ও বিভিন্ন সরঞ্জাম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। পরবর্তীতে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় নেতা এ টি এম মাছুম নেতা-কর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
দলীয় নেতাদের একটি অংশ এই ধ্বংসাত্মক ঘটনার জন্য মহানগরের নায়েবে আমির এ কে এম এমদাদুল হকের অনুসারীদের দায়ী করলেও, এ বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, আজকের কর্মসূচিতে মহানগর জামায়াতে ইসলামীর অন্যান্য নেতারা উপস্থিত থাকলেও এমদাদুল হক সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
দলীয় সূত্র আরও জানায়, বর্তমান পরিস্থিতির মূলে রয়েছেন কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ। তিনি ১৯৯৮ সাল থেকে কুমিল্লা শহর জামায়াতের আমির পদে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১১ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর তিনি পুনরায় মহানগর জামায়াতের আমিরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত একটানা ২৮ বছর তিনি কুমিল্লা শহর ও মহানগর জামায়াতের আমিরের পদে রয়েছেন। দীর্ঘ এই সময়ে নিচের সারির নেতারা নেতৃত্বের সুযোগ পাননি, যার ফলে দলের ভেতরে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিরাজ করছিল। আজকের এই ঘটনাটি মূলত সেই জমে থাকা ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।
এদিকে ঘটনার পর বিস্তারিত জানতে মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, নায়েবে আমির এ কে এম এমদাদুল হক, সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি কামারুজ্জামান সোহেলসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে মুক্তকণ্ঠ। তবে তাঁদের কেউই কথা বলতে রাজি হননি।
পরবর্তীতে রাত সোয়া ১০টার দিকে গণমাধ্যমে মহানগর জামায়াতের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাঠানো হয়। মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদের বরাতে পাঠানো ওই বক্তব্যে বলা হয়, “কুমিল্লা মহানগরীর সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে। এসব সংবাদ তাঁদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে বুধবার রাত সাতটার দিকে কুমিল্লা মহানগরী জামায়াতে ইসলামী কার্যালয়ে পূর্বনির্ধারিত একটি সভা চলছিল। এর মধ্যে কিছু যুবক প্রোগ্রামে ঢুকে হইচই শুরু করে। তারা চিৎকার করে চলে যাওয়ার সময় একটি গাড়ি ভাঙচুর করে। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”