রংপুরের পীরগঞ্জ পৌরসভার নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ ধসে পড়ার এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় দুই নির্মাণশ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং পুলিশ পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহিম প্রামাণিককে গ্রেপ্তার করেছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাতে পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক এশিয়া পোস্টকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে বুধবার সকালে নিহত শ্রমিক আছাদুলের বাবা ঠান্ডা মন্ডল বাদী হয়ে পীরগঞ্জ থানায় মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ছাড়াও পৌরসভার প্রকৌশলী, মূল ঠিকাদার, সাব-ঠিকাদার এবং ভবন তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিসহ মোট ৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকে অন্য আসামিরা আত্মগোপন করে গা-ঢাকা দিয়েছেন। অন্যদিকে, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং দায় নির্ধারণের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে উপজেলার আরাজী গঙ্গারামপুর এলাকার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে নির্মাণাধীন তিনতলা পৌর ভবনের ছাদের সাটারিং হঠাৎ ভেঙে পড়ে। সে সময় সেখানে কাজ করতে থাকা ১৩ জন শ্রমিকের মধ্যে কয়েকজন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় বাসিন্দারা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হন।
নিহত দুই শ্রমিক হলেন— গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ঠান্ডা মিয়ার ছেলে আছাদুল (২৫) এবং রংপুরের স্থানীয় বাসিন্দা শিহাব (২২)। এই দুর্ঘটনায় আরও ৪ থেকে ৫ জন শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ভিশন ২০২০’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবনটির নির্মাণকাজ পরিচালনা করছিল। অভিযোগ করা হয়েছে যে, শুরু থেকেই এই নির্মাণকাজে নানা ধরনের অনিয়ম করা হয়েছে। সাটারিংয়ে ব্যবহৃত বাঁশ ও কাঠ ছিল অত্যন্ত পুরোনো ও নিম্নমানের, যা অতিরিক্ত বোঝা সহ্য করতে না পেরে হঠাৎ ধসে পড়ে। এছাড়া কাজ চলাকালীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা পৌরসভার কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কিংবা তদারককারী প্রকৌশলী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান স্বাক্ষরিত এক আদেশে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। রংপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা প্রকৌশলী এবং সদস্যসচিব হিসেবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী।
পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ আল বাকীউল বারী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রেহেনুমা তারান্নুমকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে আমি নিজেও রয়েছি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।”
পীরগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক মুক্তকণ্ঠকে জানান, “দুই শ্রমিক নিহতের ঘটনায় ৯ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই পৌরসভার নির্বাহীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”