ফ্লাইট বাতিল হওয়া সৌদি আরবগামী যাত্রীদের অধিকাংশই বিমানবন্দরে এসেছেন তাঁদের ফ্লাইটের তথ্য জানতে। আবার কেউ কেউ অপেক্ষা করছেন বিকল্প কোনো ফ্লাইটে গন্তব্যে যেতে।

শ্রমিক ভিসায় গতকাল মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো সৌদি আরবের রিয়াদ যাওয়ার কথা ছিল বগুড়ার আনোয়ার হোসেনের। গতকাল বেলা ৩টা ৫৫ মিনিটে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইন্ডিগোর ফ্লাইট ছিল তাঁর। কিন্তু ফ্লাইটটি বাতিল হয়েছে।

এরপরও রাত পর্যন্ত এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করে পর বাইপাইলে এক আত্মীয়ের বাসায় চলে যান। বুধবার সকাল থেকে তিনি বনানীতে যে এজেন্সির কাছ থেকে টিকিট কেটেছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু যোগাযোগ করতে পারেননি। এমনকি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেননি।

আজ বিকেলে মুঠোফোনে কথা হয় আনোয়ারের সঙ্গে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মঙ্গলবার সারা দিন অপেক্ষা করেও যাইতে পারি নাই। আজ সকাল থেকে সবাইকে কল দিচ্ছি। কেউই কল ধরছে না। আমি প্রথমবার যাচ্ছি, কী করতে হবে, কিছুই বুঝতে পারছি না। এখন কীভাবে যাব, সেটাও জানি না।’

কাজে যোগ দিতে আবার নতুন টিকিট কাটা প্রসঙ্গে আনোয়ার বলেন, ‘নতুন টিকিট কাটতে তো আবারও টাকা লাগবে। এত টাকা কই পাব?’

আনোয়ার হোসেনের মতোই গতকাল রিয়াদে যাওয়ার কথা ছিল জাকির হোসেনের। তিন মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। মঙ্গলবার বেলা ১টা ১০ মিনিটে তাঁর ফ্লাইট ছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের। সেই ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় অতিরিক্ত আরও ১৬ হাজার টাকা দিয়ে আজ বুধবার রাত ১০টার মদিনাগামী একটি ফ্লাইটের টিকিট নিয়েছেন তিনি।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী থেকে আসা এই যাত্রী আজ বিকেলে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-২–এর ক্যানোপি এলাকায় দাঁড়িয়ে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বিমান থেকে বলসে (বলেছে), রুট (গন্তব্য) চেঞ্জ (পরিবর্তন) হয়েছে, সে জন্য আরও ১৬ হাজার টাকা দিতে হবে। পরে টাকা দিয়ে টিকিট নিয়েছি, আমার তো যাইতে হবে।’

জাকির হোসেন রিয়াদের একটি কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। মঙ্গলবার তাঁর ছুটি শেষ হয়েছে। ঢাকা থেকে ফ্লাইট বাতিলের খবর কফিলকে (নিয়োগকর্তা) জানালে তাঁরা বিকল্প পথে যাওয়ার কথা বলেছেন বলে জানালেন জাকির।

আতিয়ার রহমান ও সুজাউদ্দিনের ওমরাহ করতে বুধবার বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে এয়ার এরাবিয়ার একটি ফ্লাইটে যাওয়ার কথা ছিল। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তাঁরা যেতে পারেননি। এই দলে ৪০ জন ওমরাহ–যাত্রী রয়েছেন। আতিয়ার রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ফ্লাইট ধরতে সকালে আসছি। এখানে এসে বাতিলের তথ্য জানতে পেরেছি। এখন হোটেলে থাকতে হবে। অতিরিক্ত খরচ আরকি।’

সরেজমিনে আজ বুধবার বেলা একটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৫ জনের বেশি যাত্রীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ফ্লাইট বাতিল হওয়া সৌদি আরবগামী যাত্রীদের অধিকাংশই বিমানবন্দরে এসেছেন তাঁদের ফ্লাইটের তথ্য জানতে। আবার কেউ কেউ অপেক্ষা করছেন বিকল্প কোনো ফ্লাইটে গন্তব্যে যেতে। বেশির ভাগ যাত্রী বলছেন, ফ্লাইট বাতিলের তথ্য তাঁরা জানতেন না।

গত চার দিনের তুলনায় আজ অপেক্ষমাণ যাত্রীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। তবে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের সেবা দিতে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোকে দেওয়া বেবিচকের নির্দেশনা মানতে দেখা যায়নি কোনো এয়ারলাইনসের কর্মীদের। যাত্রীরা নিজেদের মতোই অপেক্ষা করছিলেন বিমানবন্দরে। অপেক্ষমাণ যাত্রীদের সার্বিক খোঁজ রাখতে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোকে গত সোমবার চিঠি দেয় বেবিচক।

বুধবার বিকেল পর্যন্ত বাতিল হওয়া কিছু ফ্লাইটের যাত্রীরা বিকল্প ফ্লাইটে সৌদি আরবে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এর আগে গত রোববার পর্যন্ত দেশটির জেদ্দা ও দাম্মাম হয়ে গিয়েছেন কিছু যাত্রী। তবে এই সংখ্যা নিশ্চিত করতে পারেনি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

শনিবার রাতে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার পর সৌদি আরবের রিয়াদগামী উড়োজাহাজের ঢাকার ফ্লাইট বাতিল হলেও আজ বুধবার থেকে দেশটির জেদ্দা ও দাম্মামগামী কিছু ফ্লাইটও বাতিল হয়েছে বলে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বাতিল হয়েছে আবুধাবিগামী ফ্লাইটও। বিমানবন্দরের ফ্লাইট–সংক্রান্ত তথ্যে জেদ্দাগামী ফ্লাইনাস এয়ারলাইনসের বিকেল সাড়ে পাঁচটার ফ্লাইটটি বাতিলের তথ্য প্রদর্শন করা হয়।

বিমানের রিয়াদ ও দাম্মামগামী ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত উড়োজাহাজ সংস্থাটি এখন জেদ্দা ও মদিনায় ফ্লাইট পরিচালনা করছে। বাতিল হওয়া ফ্লাইটের যাত্রীরা বিকল্প ফ্লাইটে সৌদি আরব যেতে চাচ্ছেন। আজ দুপুরে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর–সংলগ্ন বলাকা কার্যালয়ে গিয়ে যাত্রীদের টিকিট পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।

গাজীপুরের কালিয়াকৈর বলাকায় টিকিট পরিবর্তন করতে আসা রিয়াদগামী যাত্রী কবির আবদুল হাই মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বুধবার রাত ১২টায় রিয়াদের ফ্লাইট ছিল বিমানে। সেটি বাতিল হয়েছে। সে জন্য এখন জেদ্দা হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। জেদ্দার ফ্লাইটে যেতে পারলে ভালো হবে।’ বৃহস্পতিবার ছুটি শেষে তাঁর কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে।

সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে পরিচালনাগত বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী ১০০টি ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। এর মধ্যে কিছু ফ্লাইট বাতিল ও কিছু স্থগিত হয়েছে। এসব ফ্লাইটে বিঘ্ন ঘটায় ১৫ হাজার ৩৯৩ জন যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। এর মধ্যে ৪১টি সরাসরি এবং ৫৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট।

আজ বুধবার সন্ধ্যায় বেবিচকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ১৭টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ১০টি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের ৭টি ও রিয়াদ এয়ারের ৭টি ফ্লাইট রয়েছে।

ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ২২টি, এমিরেটসের ১৪টি, সালাম এয়ারের ৭টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৭টি, ফ্লাইদুবাইয়ের ৬টি, এয়ার ইন্ডিয়ার ২টি এবং ইজিপ্ট এয়ারের ১টি ফ্লাইট চলাচলে প্রভাব পড়েছে।

সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর দেশটির বিমানবন্দরগুলোতে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে ঢাকা থেকে সৌদিগামী ফ্লাইট চলাচলেও। এর আগে বেবিচকের দেওয়া তথ্যে ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হওয়ার পাশাপাশি ট্রানজিট ফ্লাইটেও বিঘ্নের কথা জানানো হয়েছিল।

এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মামগামী সব ফ্লাইট স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা–রিয়াদ–ঢাকা রুটের সব ফ্লাইট বাতিল করেছে।